বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে স্বামীর পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই, রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যানে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়েছে। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেল সাড়ে ৪টায় দাফন সম্পন্ন হয়।
এর আগে বুধবার বেলা ৩টা ২ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জনসমুদ্রের মধ্যে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সংসদ ভবনের ভেতরের মাঠ, বাইরের অংশ এবং আশপাশের সড়ক-অলিগলি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে। নারীদের অংশগ্রহণের জন্যও ছিল আলাদা ব্যবস্থা। জানাজা পরিচালনা করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব আবদুল মালেক এবং সঞ্চালনা করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।

১৯৮১ সালের ২ জুন এই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেই জিয়াউর রহমানের জানাজা হয়েছিল—চার দশক পর একই স্থানে স্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা ইতিহাসের এক আবেগঘন পুনরাবৃত্তি হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক উপস্থিতি
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীপ্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্যরা ও দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা।
রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ধারার প্রতিনিধিদেরও দেখা যায়—জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, এনসিপির নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আবদুল্লাহ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মামুনুল হক, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরসহ আরও অনেকে। উপস্থিত ছিলেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম এবং আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের আহমাদুল্লাহ।
আন্তর্জাতিক শ্রদ্ধা
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, ভুটানের পররাষ্ট্র ও বৈদেশিক বাণিজ্য মন্ত্রী লিয়নপো ডি এন ধুঙ্গেল, মালদ্বীপের উচ্চ শিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী আলি হায়দার আহমেদ এবং শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ। চীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও শেষ যাত্রায় অংশ নেন।

এদিন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং পাকিস্তানের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজ নিজ দেশের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে শোকবার্তা জানান।
তারেক রহমানের আবেগঘন বক্তব্য
জানাজার আগে পরিবারের পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, “মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া জীবিত থাকাকালে কারও কাছে কোনো ঋণ বা দেনা রেখে গেলে তা পরিশোধের দায়িত্ব আমি নেব। একই সঙ্গে তার কোনো কথায় বা আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে, আমি তার জন্য ক্ষমা প্রার্থী। আপনারা তার জন্য দোয়া করবেন।”
দেড় দশকের বেশি সময় যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত সপ্তাহেই সপরিবারে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। দেশে ফেরার এক সপ্তাহের মধ্যেই মাকে হারানোর শোকের পাশাপাশি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন চলাকালে দলীয় নেতৃত্বের গুরুদায়িত্বও তাকে সামলাতে হচ্ছে।
রাজনৈতিক জীবনের সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপট
১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদা জিয়ার বিয়ে হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমান ছিলেন ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক; স্বাধীনতার পর পান বীর উত্তম খেতাব। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন।
স্বামীর মৃত্যুর পর রাজনীতিতে আসেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হয়ে আমৃত্যু সে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পাঁচবার সংসদ সদস্য, তিনবার প্রধানমন্ত্রী এবং দুইবার বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন।
শেষ বিদায়
৪০ দিন ধরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর মঙ্গলবার ভোর ৬টায় খালেদা জিয়া মারা যান। তার মৃত্যুতে দেশে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয় এবং বুধবার ছিল সাধারণ ছুটি। লাখো মানুষের চোখের জল, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে অবশেষে স্বামীর পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এই প্রভাবশালী নারী নেত্রী।