আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘একপাক্ষিক, একতরফা ও অসাংবিধানিক’ আখ্যা দিয়ে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দুই দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দল দুটি অভিযোগ করেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষতা হারিয়ে একটি নিয়ন্ত্রিত ও অংশগ্রহণবিহীন নির্বাচনের আয়োজন করছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দিন রেখে ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনেই এই বর্জনের ঘোষণা এলো। ফলে ভোটের মাঠে না নামার সিদ্ধান্ত আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কারাবন্দি হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা অতীতে কয়েকটি বিতর্কিত নির্বাচন ছাড়া সব জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। দলটির মতে, একটি নির্বাচিত সাংবিধানিক সরকার অনির্বাচিত সরকারের চেয়ে শ্রেয়—এই নীতিগত অবস্থান থেকেই তারা বরাবর নির্বাচনে ছিল। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারা আসন্ন নির্বাচন ও গণভোটকে ‘অসাংবিধানিক প্রহসন’ হিসেবে দেখছে।
জাসদের দাবি, সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্সে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের দিনই তারা একটি স্পষ্ট নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কার মতো ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বদলে সরকার ‘ফন্দিফিকির ও তালবাহানা’ করে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করছে।
দলটি অভিযোগ করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বদলে বিভাজিত রাজনীতির একটি পক্ষকে প্রকাশ্যে মদদ দিচ্ছে এবং অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছে। হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা, গ্রেপ্তার এবং আইনি প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগও তুলেছে জাসদ।
জাসদের বিবৃতিতে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে পুনর্বাসনের অভিযোগও রয়েছে। দলটি বলেছে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা ধ্বংস, সঙ্গীত ও নাট্যচর্চায় বাধা, আদিবাসী ও লোকসংস্কৃতির ওপর হামলা এবং সুফিবাদী ধারার বিরুদ্ধে আঘাত—সব মিলিয়ে একটি ‘নরক গুলজার পরিস্থিতি’ তৈরি করা হয়েছে।
এদিকে, ওয়ার্কার্স পার্টি ছয়টি নির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে নির্বাচন থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছে। দলটির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন দলটি বলছে, নির্বাচন কমিশন ‘বিশেষ রাজনৈতিক চাপে’ নিরপেক্ষতা হারিয়েছে এবং একটি একপেশে নির্বাচনের দিকে দেশকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রথমত, নির্বাচন কমিশন নির্বাচন প্রস্তুতির সময় নিবন্ধিত দল হওয়া সত্ত্বেও ওয়ার্কার্স পার্টিকে সংলাপে ডাকেনি বা কোনো চিঠি দেয়নি। দ্বিতীয়ত, তফসিল ঘোষণার পর দেশে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে বলে দাবি করেছে দলটি। তারা রাজনৈতিক হত্যা, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, সংবাদপত্র কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, ছায়ানট ও উদীচীর কার্যালয় তছনছের ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে।
তৃতীয় কারণ হিসেবে দলটি মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জামানত ও সিডি কেনার শর্তকে দায়ী করেছে, যা কালো টাকার ব্যবহার বাড়াবে এবং সাধারণ মানুষের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ সংকুচিত করবে। চতুর্থত, সরকার পতনের পর লুট হওয়া অস্ত্র ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় নির্বাচনি সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ছে বলে দাবি করেছে ওয়ার্কার্স পার্টি।
পঞ্চম কারণ হিসেবে দলটি অভিযোগ করেছে, সরকার সমর্থিত ‘মবগোষ্ঠী’ গত নভেম্বর থেকে তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ একাধিক কার্যালয় দখলে রেখেছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আবেদন জানানো হলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ষষ্ঠত, সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকাকে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে দলটি।
ওয়ার্কার্স পার্টির মতে, অন্তর্বর্তী সরকার একটি অংশগ্রহণবিহীন নির্বাচনের পথে হাঁটছে, যা দেশে গণতন্ত্র, শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে না; বরং নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি করবে।
দুটি দলই মনে করছে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে সাংবিধানিক গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে না। বরং এটি উগ্রবাদ, মববাদ ও অস্থিতিশীলতাকে আরও উৎসাহিত করবে। তাদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত তাকেই নিতে হবে।