দেশের অন্য জেলাগুলোতে যখন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে প্রচার–প্রচারণা, পোস্টার–ব্যানার আর মিছিল–মিটিংয়ের পরিবেশ, তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। এখানে নেই নির্বাচনী উত্তাপ, নেই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস। স্থানীয় ভোটার, সাংবাদিক ও নির্বাচন–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাহাড়ে এবারের নির্বাচন অনেকটাই ‘পানসে’, আগ্রহহীন ও একতরফা হয়ে পড়েছে।
এর প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর অনুপস্থিতি। পার্বত্য অঞ্চলের প্রভাবশালী তিনটি সংগঠন—পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর দুটি অংশ ইউপিডিএফ (প্রসীত খীসা) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)—এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে এই দলগুলো পাহাড়ি বা আদিবাসী ভোটারদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। ফলে তাদের প্রার্থী না থাকায় ভোটের প্রতিযোগিতা ও অংশগ্রহণ দুটোই কমে গেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, পাহাড়ে নির্বাচন মানেই আগে ছিল রাজনৈতিক টানটান উত্তেজনা। আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থনে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দেখা যেত। কিন্তু এবার সেই দৃশ্য নেই। অনেক এলাকায় প্রচারণাও সীমিত, জনসভা ছোট, মাঠে নেই তেমন কর্মী–সমর্থক। ফলে নির্বাচনী উৎসবের বদলে বিরাজ করছে নিস্তরঙ্গতা।
রাঙামাটি দেশের সবচেয়ে বড় জেলা এবং এখানে প্রায় পাঁচ লাখের বেশি ভোটার। এদের বড় অংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। ঐতিহাসিকভাবে এই ভোটব্যাংক আঞ্চলিক দলগুলোর প্রতি অনুগত। ২০১৪ সালে জেএসএস প্রার্থী জয়ী হয়েছিল, আর ২০২৪ সালের নির্বাচনে দলটির অনুপস্থিতিতে বহু কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত কম—কিছু কেন্দ্রে কেউ ভোট দিতেও যাননি।

ভোটারদের একটি অংশ বলছেন, আঞ্চলিক দল না থাকলে তারা নিজেদের প্রতিনিধিত্ব খুঁজে পান না। ফলে নির্বাচনের প্রতি আগ্রহও কমে যায়। রাঙামাটি শহরের কলেজ মোড়ের এক তরুণ আদিবাসী ভোটার বলেন, “আমাদের মূল দাবি শান্তি আর সম্প্রীতি। কিন্তু যারা পাহাড়ের বাস্তবতা বোঝে, তারা মাঠেই নেই। তাহলে ভোট দিয়ে কী হবে?”
অন্যদিকে, পাহাড়ে সাম্প্রতিক সহিংসতা, সংঘাত ও নিরাপত্তা শঙ্কাও ভোটের পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। পর্যটননির্ভর অর্থনীতি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্থিতিশীলতা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। যেহেতু আদিবাসী দলগুলো নেই, কে জিতবে কে হারবে তা নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ না থাকলেও প্রত্যাশা অন্তত যেই জিতুক, আগে শান্তি নিশ্চিত করুক।

মূল শক্তি আঞ্চলিক দলগুলোর অনুপস্থিতিতে এবার মূল লড়াইয়ে আছে বিএনপি ও জামায়াত জোটসহ কয়েকটি জাতীয় দল। তবে শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক হচ্ছে না বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। বিশ্লেষকদের মতে, অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন না হলে ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্গম এলাকায় হেলিকপ্টারে করে ভোটকর্মী ও সরঞ্জাম পাঠানো হবে। নিরাপত্তায় থাকছে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—ভোটারদের অংশগ্রহণ।
সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে এবারের নির্বাচন উৎসবের নয়, বরং অনীহা ও অনিশ্চয়তার। আঞ্চলিক দলবিহীন এই ভোট কতটা প্রতিনিধিত্বশীল ও প্রতিযোগিতামূলক হবে—সেই প্রশ্নই এখন পাহাড়ের জনপদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।