অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের রহস্যজনক মৃত্যুর মিছিলে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক প্রলয় চাকী। তিনি পাবনা জেলা কারাগারে আটক ছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, কারা কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও সময়মতো উন্নত চিকিৎসা না পাওয়ায় তার মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাটি দেশের কারাগারে আওয়ামী লীগের বন্দী নেতা-কর্মীদের চিকিৎসা, মানবাধিকার এবং হেফাজতে মৃত্যু নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
কারা কর্তৃপক্ষ দাবী করেছে, প্রলয় চাকী দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও গুরুতর চোখের সমস্যায় ভুগছিলেন। গত শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি সকালে কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন। পরে তাকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার (১১ জানুয়ারি) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে তিনি মারা যান।
প্রলয় চাকীর ছেলে ও সংগীত পরিচালক সানী চাকী অভিযোগ করেন, আটকের সময় তার বাবা সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। কারাগারে আটক অবস্থায় শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়া সত্ত্বেও যথাসময়ে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়নি। পাবনা জেনারেল হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধার অভাব এবং রাজশাহীতে স্থানান্তরে বিলম্ব তার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে বলে তিনি দাবি করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে এটিকে কারা কর্তৃপক্ষের ইচ্ছাকৃত গাফিলতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রলয় চাকীকে গত ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫-এ পাবনার নিজ বাড়ি থেকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) আটক করে। ডিবি পুলিশের দাবি ছিল, এটি ‘ডেভিল হান্ট’ অভিযানের অংশ। আটকের পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।। পরিবার জানায়, আটকের সময় কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখানো হয়নি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই মৃত্যু কারা হেফাজতে আওয়ামী লীগ নেতাদের মৃত্যুর উদ্বেগজনক যে ধারা শুরু হয়েছে তারই অংশ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের কারাগারে ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৬৯ জন ছিলেন বিচারাধীন বন্দী।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে (ইউনূস সরকার ক্ষমতায় আসার পর) কারাগারে বা পুলিশ হেফাজতে পঞ্চাশাধিক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে বগুড়া কারাগারে এক মাসে চারজন, নওগাঁয় এক সপ্তাহে সাতজন, গাইবান্ধায় তারিক রিফাত, মুন্সীগঞ্জে সারোয়ার হোসেন নান্নু, গাজীপুরের কাশিমপুরে ওয়াসিকুর রহমান বাবু এবং আরও অনেকের নাম উল্লেখযোগ্য। এসব ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষ ‘হৃদ্রোগ’ বা ‘পূর্ব-অসুস্থতা’র কথা বললেও স্বজন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো নির্যাতন, চিকিৎসা অবহেলা ও পরিকল্পিত হত্যার কথা বলছে এবং স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে।
প্রলয় চাকীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বন্দী আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু অধিকার এবং কারাগারে চিকিৎসা ব্যবস্থার মান নিয়ে দেশজুড়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।