ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন আসনে ফল ঘোষণা, পুনর্গণনার দাবি, ‘জাল ভোট’ ও ‘ফল টেম্পারিং’-এর অভিযোগকে ঘিরে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই রিটার্নিং কর্মকর্তারা একে একে ফলাফল ঘোষণা করেন। বিশেষ করে ঢাকা-৮, ঢাকা-১৩, ঢাকা-১৭ এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জেলায় নাটকীয়তা ছিল সবচেয়ে বেশি।
ঢাকা-৮: অল্প ব্যবধানে মির্জা আব্বাসের জয়, বাতিল ভোট নিয়ে বিতর্ক
ঢাকা-৮ আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ৪৯৮০ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৫৫২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রার্থী নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী পেয়েছেন ৫১ হাজার ৫৭২ ভোট।

ফল ঘোষণার আগে থেকেই বাতিল ভোট নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। এ আসনে ২৪৯৭টি ভোট বাতিল করা হয়েছে। বিএনপির অভিযোগ, ব্যালটের ধানের শীষের পাশে ফাঁকা জায়গায় পড়া সিলগুলোও তাদের পক্ষে গণনা করা উচিত। বিপরীতে এনসিপি দাবি করেছে, সেগুলোকে বৈধ ধরা যাবে না। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নির্বাচন কমিশনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পুনর্গণনার দাবি জানান।
ঢাকা-১৩: ‘জাল ভোট’ অভিযোগে কমিশনে মামুনুল
ঢাকা-১৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মামুনুল হক রাতেই আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনে উপস্থিত হয়ে অভিযোগ করেন, অন্তত ৫০টি কেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক ভোট বাতিল করা হয়েছে এবং ফল প্রকাশে বিলম্ব করা হয়েছে। তার দাবি, ব্যবধান প্রায় ২২০০ ভোট হলেও ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে ফল পাল্টানো হয়েছে। একাধিক কেন্দ্রে ‘টেম্পারিং’ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ঢাকা-১৭: তারেক রহমানের জয়
দিনভর নজর ছিল ঢাকা-১৭ আসনে। অবশেষে ভোরে ঘোষণা আসে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ৪৩৯৯ ভোটে জয়ী হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ৭২ হাজার ৬৯৯ ভোট, আর জামায়াত সমর্থিত প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ৬৮ হাজার ৩০০ ভোট। এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৩ জন; ভোট পড়েছে ৪৪.৩০ শতাংশ।

পিরোজপুর: সাঈদীর দুই ছেলের ভাগ্য ভিন্ন
পিরোজপুরের তিনটি আসনের মধ্যে দুটিতে বিএনপি ও একটিতে জামায়াত জয় পেয়েছে। প্রয়াত দেলোয়ার হোসেন সাঈদী-এর ছোট ছেলে মাসুদ সাঈদী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৫৯ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তবে বড় ছেলে শামীম সাঈদী বিএনপি প্রার্থীর কাছে হেরে গেছেন।
অন্য দুই আসনে বিএনপি প্রার্থীরা জয় নিশ্চিত করেন।
রাজবাড়ী: দুটি আসনই ধানের শীষ
রাজবাড়ী-১ ও রাজবাড়ী-২—দুই আসনেই বিএনপি প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে জয় পান। আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম ও হারুন-অর-রশিদ যথাক্রমে প্রায় দেড় লাখ ও আড়াই লাখের বেশি ভোটে নির্বাচিত হন।
ঢাকা জেলায় রাজধানীর বাইরের ৫ আসনেই বিএনপি
ঢাকা-১, ২, ৩, ১৯ ও ২০—সবকটিতেই বিএনপি জয় পেয়েছে। এসব আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে থেকে ফল নিশ্চিত করেন।
পাবনা: মিশ্র ফলাফল
পাবনার পাঁচ আসনের তিনটিতে জামায়াত ও দুটিতে বিএনপি জয়ী হয়েছে। পাবনা-১, ৩ ও ৪-এ দাঁড়িপাল্লা প্রতীক এগিয়ে থাকে। অন্যদিকে পাবনা-২ ও ৫-এ ধানের শীষ জয়ী হয়।

রংপুর: জামায়াতের আধিপত্য
রংপুরের ছয় আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জামায়াত জয় পেয়েছে। রংপুর-৪ আসনে এনসিপি প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। বিএনপি এখানে একটিও আসনে জয় পায়নি, যা দলটির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফেনী: সব আসন বিএনপির
ফেনী-১, ২ ও ৩—সবকটিতেই বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। তিন আসনেই উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে ধানের শীষ এগিয়ে থাকে।
রাজশাহী: ৪টি বিএনপি, ২টি জামায়াত
রাজশাহীর ছয় আসনের চারটিতে বিএনপি ও দুটিতে জামায়াত জয় পায়। কয়েকটি আসনে ভোটের ব্যবধান তুলনামূলক কম থাকলেও শেষ পর্যন্ত ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে লড়াই জমে ওঠে।

ফল ঘোষণায় ‘গড়িমসি’ অভিযোগ
জামায়াত নেতারা অভিযোগ করেছেন, কিছু আসনে ফল ঘোষণায় অস্বাভাবিক বিলম্ব করা হয়েছে এবং ‘ওভাররাইটিং’ করে ভোট কমানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা না পেলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে দলটি। একইভাবে এনসিপি সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করে ‘ম্যানিপুলেশন’-এর অভিযোগ তুলেছে।
সার্বিক চিত্র
দেশজুড়ে ফলাফলে বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে জয় পেয়েছে। তবে ভোট বাতিল, ফল প্রকাশে বিলম্ব, পুনর্গণনার দাবি ও কারচুপির অভিযোগে নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি উত্তপ্ত। বিভিন্ন জেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত মোতায়েন দেখা গেছে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেওয়া হলেও, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস ও উত্তেজনা এখনো কাটেনি। ফলাফলের চূড়ান্ত ঘোষণা ও সম্ভাব্য পুনর্গণনা নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।