বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, নির্বাচন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ছেলে এবং প্রধানমন্ত্রীর সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, দেশে এখন কার্যত একটি “অনির্বাচিত ও উগ্র ইসলামপন্থী প্রভাবিত শাসনব্যবস্থা” ক্ষমতায় আছে, যা গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট ছাড়াই রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। তিনি দাবি করেন, আসন্ন নির্বাচন অবাধ বা নিরপেক্ষ হওয়ার কোনো পরিবেশ নেই; বরং এটি “একটি মঞ্চস্থ প্রদর্শনী”তে পরিণত হয়েছে।
সোমবার কলকাতার সাংস্কৃতিক মঞ্চ ‘খোলা হাওয়া’র আয়োজনে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে লেখা একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দীর্ঘ বক্তব্যে জয় আন্দোলনের পটভূমি, অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা, বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতি, আন্তর্জাতিক প্রভাব এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নানা অনিয়ম নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
কোটা আন্দোলন: ‘যোগাযোগ ব্যর্থতা, ষড়যন্ত্রে সহিংসতা’
জয় বলেন, শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের দাবি অযৌক্তিক ছিল না। “পুরোনো কোটা ব্যবস্থা ছিল অচল। আওয়ামী লীগ সরকার বহু আগেই তা বাতিল করেছিল। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের একটি মামলার প্রেক্ষিতে আদালত কোটা পুনর্বহাল করে,” বলেন তিনি।
তার দাবি, সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল বিষয়টি জনগণকে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা না করা। “আমরা জনগণকে ঠিকঠাক জানাতে পারিনি যে এটি আদালতের সিদ্ধান্ত। ফলে আন্দোলন ভুল বোঝাবুঝির ওপর দাঁড়িয়ে বড় হয়,” বলেন জয়।
তবে তিনি অভিযোগ করেন, পরে উগ্রপন্থী গোষ্ঠী, সশস্ত্র জঙ্গি এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাব আন্দোলনে ঢুকে পড়ে এবং পরিস্থিতিকে সহিংস করে তোলে। “পুলিশ স্টেশন আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ—এসব শুরু করে সশস্ত্র গোষ্ঠী। সরকার কখনও মৃত্যু চায়নি,” বলেন তিনি।
নিহতের সংখ্যা ও দায় প্রশ্নে বক্তব্য
জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে ১,৪০০ জন নিহতের কথা উল্লেখ থাকলেও জয় বলেন, ওই হিসাবের মধ্যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকার সময়ের মৃত্যুও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
“৫ আগস্টের পর ১০ দিন যারা নিহত হয়েছেন—তাদের অনেকেই ছিলেন পুলিশ ও আওয়ামী লীগের কর্মী। তবুও সব দায় আমাদের ওপর চাপানো হয়েছে,” বলেন তিনি।
তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকার সব হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল এবং কাউকে দায়মুক্তি দেয়নি। বিপরীতে বর্তমান সরকার অধ্যাদেশ দিয়ে ‘মব জাস্টিস’-এ জড়িতদের দায়মুক্তি দিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে কঠোর সমালোচনা
অন্তর্বর্তী সরকারকে “ম্যান্ডেটহীন” আখ্যা দিয়ে জয় বলেন, ক্ষমতায় এসেই তারা “দণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গিদের মুক্তি দিয়েছে।” তিনি হলি আর্টিজান হামলা, ব্লগার হত্যা ও কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের ওপর হামলার মতো ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের মুক্তির অভিযোগ তোলেন।
তার দাবি, এই সরকার উগ্র ইসলামপন্থীদের সমর্থনেই টিকে আছে। “এরা সরাসরি মবকে ব্যবহার করছে। বিচারক, সাংবাদিক, বিরোধী কণ্ঠ—যে কেউ কথা বললে বাড়ি ঘেরাও, হামলা, ভাঙচুর করা হচ্ছে,” বলেন জয়।
তিনি উল্লেখ করেন, বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্র কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে, যা সরকারের নিষ্ক্রিয়তার ফল।
নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা
আসন্ন নির্বাচনকে “একতরফা” উল্লেখ করে জয় বলেন, কার্যত আওয়ামী লীগসহ সব প্রগতিশীল দলকে কোণঠাসা করা হয়েছে। “দুই ঘোড়ার দৌড়—বিএনপি ও জামায়াত। অন্য দলগুলোকে দমন করা হচ্ছে,” বলেন তিনি।
তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগের ওপর ‘ডি-ফ্যাক্টো’ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। দলীয় কার্যালয়ে হামলা, নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার এবং প্রচারণা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। “আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রগতিশীল দলগুলোকে দমন করা হয়েছে। জাতীয় পার্টির অফিস পুড়েছে, নেতারা কারাগারে,” বলেন তিনি।
তার মতে, “এটি কোনো প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন নয়; বরং পূর্বনির্ধারিত ফলের প্রদর্শনী।”
ডাকযোগে ভোট ও কারচুপির অভিযোগ
প্রথমবারের মতো ডাকযোগে ভোট চালুর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে জয় বলেন, “বাংলাদেশে এটি যাচাই করা প্রায় অসম্ভব। হাজার হাজার ব্যালট একসঙ্গে খুলে আগেই জামায়াতের পক্ষে সিল মারা হচ্ছে—এমন ভিডিও প্রকাশ্যে এসেছে।”
তিনি বলেন, “নির্বাচন দিবসে কারচুপি করলে তা ধরা পড়ে। কিন্তু পোস্টাল ভোটে কোনো পর্যবেক্ষণ নেই।”
বিএনপি, যুক্তরাষ্ট্র ও গণভোট প্রসঙ্গ
বিএনপিকে লক্ষ্য করে জয় বলেন, দলটি এখন বিদেশি শক্তির প্রভাবাধীন। তার অভিযোগ, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দুর্নীতির প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাকে আইনি পদক্ষেপের বাইরে রাখা হয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থে।
“যে কোনো সময় তাকে চাপে রাখতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ভবিষ্যতে বিএনপি সরকার দুর্বল ও নিয়ন্ত্রিত হবে,” বলেন জয়।
গণভোট প্রসঙ্গে বলেন, “সংবিধানে গণভোটের সুযোগ নেই। আদালত একে অসাংবিধানিক বলেছে। তবুও সরকার এটি করছে। বিএনপি আগে বিরোধিতা করলেও হঠাৎ সমর্থন দিয়েছে।”
তার মতে, দুর্বল জোট সরকার তৈরি করাই বিদেশি শক্তির লক্ষ্য।
জামায়াত নিয়ে সতর্কবার্তা
জামায়াতে ইসলামীর উত্থানকে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন জয়। তার ভাষ্য, দলটির ভোটভিত্তি ঐতিহাসিকভাবে ৫–১০ শতাংশের বেশি নয়, কিন্তু আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে তাদের কৃত্রিমভাবে শক্তিশালী করা হচ্ছে।
“জামায়াতের লক্ষ্যই হলো শরিয়া আইনভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। কোনো ‘মডারেট ইসলামিস্ট’ বলে কিছু নেই,” বলেন তিনি।
সংখ্যালঘু ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
জয় দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরে সংখ্যালঘুরা সবচেয়ে নিরাপদ ছিল এবং জঙ্গিবাদ কঠোরভাবে দমন করা হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু ও উদারপন্থীরা ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি ভারতের নিরাপত্তা নিয়েও সতর্ক করে বলেন, “বাংলাদেশে ইসলামপন্থী শক্তির উত্থান ভারতের পূর্ব সীমান্তের জন্যও হুমকি হতে পারে।”
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান
বক্তব্যের শেষাংশে জয় আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানান, আসন্ন নির্বাচনকে অবাধ-নিরপেক্ষ নয় বলে আগেই ঘোষণা করতে। “আওয়ামী লীগকে মানুষ ভোট না দিলে সমস্যা নেই। কিন্তু অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়ে নির্বাচন করলে তা গণতন্ত্র নয়,” বলেন তিনি।
তার ভাষায়, “এখনই কথা বলার শেষ সময়। নাহলে বাংলাদেশ আগামী পাঁচ থেকে দশ বছর গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।”