সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে তার সঙ্গে আলোচনায় বসতে তার আপত্তি নেই। তবে একই সঙ্গে তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দিয়ে ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত জয় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভি–কে দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমি সবসময়ই উন্মুক্ত। আমি এমন একজন মানুষ, যে সবসময় আলোচনায় বিশ্বাস করে তা যত কঠিনই হোক বা যার সঙ্গেই হোক।” তার ভাষায়, সংলাপই তার রাজনৈতিক কৌশল।
নির্বাচন নিয়ে আপত্তি
সাক্ষাৎকারে জয় দাবি করেন, দেশের সবচেয়ে বড় দল এবং প্রগতিশীল শক্তিগুলোকে বাইরে রেখে নির্বাচন আয়োজন করা হয়েছে। তার অভিযোগ, এভাবে সাজানো নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, তাদের প্রকৃত জনসমর্থনের তুলনায় বেশি প্রভাব পেয়েছে। তিনি বলেন, “দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের একটি নিষিদ্ধ রেখে নির্বাচন হলে সেটিকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলা যায় না।”
আইটিভির সাংবাদিক মাহাথির পাশা তাকে মনে করিয়ে দেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও জামায়াত নির্বাচন করতে পারেনি। জবাবে জয় দাবি করেন, দলটিকে সরকার নয়, আদালতের রায়ের কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়েছিল; গঠনতন্ত্র সংশোধন করলে তারা অংশ নিতে পারত।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা যদি নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য বলেন, সেটি মেনে নেবেন কি না—এ প্রশ্নে জয় বলেন, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের স্বাধীনভাবে চলাচলের সুযোগ সীমিত ছিল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো ছিল না। তাই তাদের মূল্যায়ন নিয়ে তিনি চূড়ান্ত মন্তব্য করতে রাজি নন।
অতীতের নির্বাচন ও অনিয়ম প্রসঙ্গ
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জয় বলেন, গত তিন নির্বাচনের মধ্যে প্রথম ও তৃতীয়বার বিরোধীরা নির্বাচন বর্জন করেছিল। দ্বিতীয়বারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জরিপে আওয়ামী লীগের বিপুল জয়ের পূর্বাভাস ছিল বলে তিনি দাবি করেন। তার বক্তব্য, প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি অনিয়ম করে থাকতে পারে, তবে তা সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব ফেলেনি।
‘চব্বিশের আন্দোলন’ ও প্রাণহানি
২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের আন্দোলন নিয়ে জয় কিছু ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেন। তার মতে, আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও পরে সহিংসতা যুক্ত হয় এবং সরকার বিষয়টি সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে পারেনি। তিনি অভিযোগ করেন, ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো আন্দোলনকে সরকার পতনের দিকে ঠেলে দেয়।
জাতিসংঘের হিসাবে ওই সময়ে ১,৪০০ জন নিহত হওয়ার তথ্য তুলে ধরে নিহতদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইবেন কি না—এ প্রশ্নে জয় বলেন, নিহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্য ও দলীয় কর্মীরাও ছিলেন। “কয়েকশ মানুষের মৃত্যু হয়েছে—এটি অবশ্যই দুঃখজনক,” বলেন তিনি। শেখ হাসিনা কখনও প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেননি বলেও দাবি করেন জয়।
শিশু নিহতের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার তখনই নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং সমবেদনা জানিয়েছে। ফাঁস হওয়া অডিওতে শেখ হাসিনাকে ‘হত্যার নির্দেশ’ দিতে শোনা গেছে—এ অভিযোগ প্রসঙ্গে জয় বলেন, প্রচারিত অংশটি সম্পাদিত; পুরো বক্তব্যে সহিংসতা দমনে আইনানুগ পদক্ষেপের কথা ছিল।
দণ্ড, নির্বাসন ও ভবিষ্যৎ
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড প্রসঙ্গে জয় বলেন, তার মা একদিন দেশে ফিরবেন, তবে এখন তা নিরাপদ নয়। তার মতে, ভারতই শেখ হাসিনার জন্য “সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা”।
নিজের বিরুদ্ধে প্লট দুর্নীতির মামলায় কারাদণ্ডের প্রসঙ্গে জয় বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। ভবিষ্যতে দেশে ফিরবেন কি না—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “একসময় অবশ্যই ফিরব।” তবে প্রধানমন্ত্রিত্বের কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার নেই বলে দাবি করেন।
আওয়ামী লীগের সংস্কার ও ভবিষ্যৎ
দলের ভবিষ্যৎ ও সংস্কার প্রসঙ্গে জয় বলেন, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। বর্তমান পরিস্থিতিতে দলীয় কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং নেতাকর্মীরা নিরাপদ নন বলে তিনি অভিযোগ করেন। “পরিস্থিতি বদলাবে, সবসময়ই বদলায়,” মন্তব্য করেন তিনি।
তারেক রহমান ‘প্রতিশোধের রাজনীতি’ এড়াতে চান—এই প্রেক্ষাপটে মামলা প্রত্যাহারের অনুরোধ করবেন কি না জানতে চাইলে জয় বলেন, এটি দলের সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, “তিনি যদি প্রধানমন্ত্রী হন, আমরা অবশ্যই তার সঙ্গে কথা বলব এবং কাজ করব।”
বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব বিতর্ক
মুজিব ও জিয়া পরিবারে বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের সমালোচনা প্রসঙ্গে জয় বলেন, দলীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে তৃণমূলই নেতৃত্ব নির্বাচন করে। “আমি চাইলে অনেক আগেই নির্বাচনে দাঁড়াতে পারতাম,” বলেন তিনি, তবে ক্ষমতা বা অর্থ তার লক্ষ্য নয় বলেও দাবি করেন।
সাক্ষাৎকারে জয় একদিকে নির্বাচন ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন, অন্যদিকে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সংলাপের পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত দেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, আওয়ামী লীগ বর্তমান পরিস্থিতিকে অস্থায়ী মনে করছে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সম্ভাবনা দেখছে।