সর্বশেষ

যিনি সিনেমাকে চিন্তার ভাষা বানিয়েছিলেন

ইরানি পরিচয়ের খোঁজে বাহরাম বেজাইয়ের ক্যামেরা

প্রকাশিত: ৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩০
ইরানি পরিচয়ের খোঁজে বাহরাম বেজাইয়ের ক্যামেরা

ইরানি নিউ ওয়েভ চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম পথপ্রদর্শক বাহরাম বেজাই কেবল একজন চলচ্চিত্র পরিচালকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন থিয়েটার নাট্যকার, ভাষাতাত্ত্বিক, সংস্কৃতিতাত্ত্বিক এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ভাবনায় এক অনন্য বৌদ্ধিক উপস্থিতি। তাঁর সৃষ্টিকর্ম ইরানি সমাজ, ইতিহাস ও দর্শনের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে কল্পকাহিনীর ভূমিকাকে বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে নতুন অর্থ নির্মাণ করেছে।

 

 

বাহরাম-এর কাজ ইরানি চলচ্চিত্রে এক স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রেখেছে। যেখানে সাম্রাজ্যবাদ, পরিচয়বোধ, প্রেম ও ঐতিহ্য একসঙ্গে প্রবাহিত হয়। তাঁর চলচ্চিত্রে সাধারণ জীবনবোধের ভেতর দিয়ে উঠে আসে ইতিহাস ও মিথিক্যাল স্তরের গভীর প্রশ্ন যা আধুনিক ইরানি পরিচয়ের সন্ধানে দর্শককে ভাবনায় নিমজ্জিত করে।

 

তাঁর আবির্ভাবের আগে ইরানি চলচ্চিত্র অনেকটাই বাণিজ্যিক গল্প ও বিনোদনের গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিল। তাঁর মতো নির্মাতারাই চলচ্চিত্রকে একটি ন্যারেটিভ, সাংস্কৃতিক ও দর্শনীয় মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলে ইরানের সমকালীন চলচ্চিত্র এক গভীর মানবিক ও বৌদ্ধিক স্তরে উন্নীত হয়; যেখানে চলচ্চিত্র আর কেবল বিনোদন নয় বরং চিন্তার অনুঘটক।

 

  

১৯৭২ সালে নির্মিত ‘ডাউনপোর’ চলচ্চিত্র বাহরাম-এর প্রারম্ভিক অথচ সবচেয়ে প্রভাবশালী কাজগুলোর একটি। এক শিক্ষককে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে সমাজের ভাঙা যোগাযোগ ব্যবস্থা, গভীর একাকিত্ব এবং সংযত মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। কেন্দ্রীয় চরিত্রের ব্যক্তিগত বঞ্চনা, শ্রেণিগত বৈষম্য ও সামাজিক প্রত্যাশার সঙ্গে তার অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে বাহরাম বেজাই এক নতুন বৌদ্ধিক ও নান্দনিক চলচ্চিত্রভাষার সূচনা করেন; যার প্রভাব পরবর্তী ইরানি চলচ্চিত্রে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

 

এরপর তাঁর ‘দ্য লিটল স্ট্রেঞ্জার’ ইরানি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য সাক্ষর হয়ে ওঠে। যুদ্ধাহত এক আফ্রিকান-ইরানি শিশুর গল্পের মধ্য দিয়ে এই চলচ্চিত্র জাতিগত, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের প্রশ্নকে গভীর সংবেদনশীলতায় সামনে আনে। সমাজের ভেদাভেদ, মানবিকতা এবং অপরকে গ্রহণ করার নৈতিক গুরুত্ব এখানে বেশ শক্তভাবেই উচ্চারিত হয়। ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিনির্ভর জীবনের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে মানবিক পরিচয়ের বিস্তৃত অর্থ অনুসন্ধান ইরানি চলচ্চিত্রে এটি ছিল এক যুগান্তকারী প্রয়াস।

 

 

ইরানের প্রাচীন ইতিহাস ও রাজনীতি-ভাবনাকে থিয়েট্রিক্যাল রূপকে উপস্থাপন করে ‘ডেথ অব ইয়াজদেগার্ড’ চলচ্চিত্রে বাহরাম ‘রাজা ও জনতা’র সম্পর্ক, ক্ষমতার তথাকথিত সত্য এবং ইতিহাস কীভাবে নির্মিত ও পুনর্লিখিত হয় সেইসব প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দর্শককে দাঁড় করান। এই চলচ্চিত্র ইতিহাসকে একটি স্থির সত্য হিসেবে নয় বরং বিতর্কিত ও বহুমাত্রিক এক বয়ান হিসেবে দেখার সাহস জোগায়।

 

বাহরাম-এর সংলাপ কখনোই নিছক কথোপকথন নয়। সেগুলো সমাজ, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের বহুস্তরীয় জটিলতাকে স্পর্শ করে। তাঁর সংলাপের ভেতর দিয়ে চরিত্ররা কথা বলার পাশাপাশি প্রশ্ন তোলে, দ্বিধা প্রকাশ করে এবং সমাজের অদৃশ্য ফাটলগুলোকে ভাষা দেয়। বিশেষ করে ‘বাসু, দ্যা লিটল স্ট্রেঞ্জার’ চলচ্চিত্রে সেই স্মরণীয় দৃশ্যে বই হাতে শিশুটির উচ্চারণ-“উই আর অল দ্য চিলড্রেন অব ইরান”। এই উচ্চারণ পুরো চলচ্চিত্রের মানবিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই এক বাক্যে বাহরাম জাতীয়তার সংকীর্ণ সংজ্ঞা ভেঙে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের অন্তর্গত ঐক্যকে স্পষ্ট করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন পরিচয়ের ভেদরেখা যতই গভীর হোক, মানবিক বন্ধন তার চেয়েও শক্তিশালী ও বিস্তৃত।

 

 

বাহরাম-এর থিয়েটার পটভূমি তাঁর চলচ্চিত্রভাষায় এনে দিয়েছে স্পষ্ট রূপক ও মেটাফোরিক গভীরতা। প্রাচীন পারস্যের মিথ, লোকজ আখ্যান এবং আধুনিক নাট্যরীতিকে এমন দক্ষতায় তিনি মিলিয়েছেন যে কল্পনা ও বাস্তবতার মাঝখানে এক স্বতন্ত্র, শনাক্তযোগ্য ন্যারেটিভ পরিসর গড়ে উঠেছে; যেখানে ইতিহাস, স্মৃতি ও বর্তমান একে অন্যের সঙ্গে অবিরাম সংলাপে প্রবেশ করে।

 

ডিসেম্বর-এর ২৬ তারিখে ৮৭ বছর বয়সে বাহরাম বেজাই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তাঁর মৃত্যুতে ইরানের বহু চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সংস্কৃতিকর্মী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশে তিনি তেমন পরিচিত নন কিন্তু তাঁর কাজ ইরানি চলচ্চিত্রের মননশীল ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে দৃঢ় করে দেওয়া এক স্থায়ী উত্তরাধিকার। তাঁর চলচ্চিত্র শুধু গল্প বলার মাধ্যম নয় সেগুলো চিন্তা, ইতিহাস ও সমাজের সঙ্গে সংলাপের চিরস্থায়ী শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। এই কারণেই বাহরাম বেজাইয়ের চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রচর্চা ও পাঠক্রমে পাঠ্য হিসেবে সবসময় বিবেচিত হবে।

  

 

একজন শিল্পী চলে যান কিন্তু তাঁর প্রশ্নগুলো থেকে যায়। বাহরাম বেজাই সেই বিরল চলচ্চিত্র নির্মাতা যিনি চলচ্চিত্রকে প্রশ্ন করার সাহস শিখিয়েছেন। তাঁর বিদায়ে ইরানি চলচ্চিত্র এক নীরব অভিভাবককে হারালো; আর আমরা হারালাম ইতিহাস, মানবিকতা ও কল্পনার এক অনন্য ভাষ্যকারকে। যদিও তাঁর কর্মই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চলচ্চিত্রকারদের পথ দেখাবে।

সব খবর