বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে বড় আকারের সেট তৈরির সংকট দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। পর্যাপ্ত জায়গা নেই, নেই দক্ষ জনবল, নেই আধুনিক প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান। ফলে বড় বাজেটের সিনেমাগুলো ক্রমেই বিদেশমুখী হয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার জন্য এফডিসির দুই নম্বর ফ্লোরে তৈরি করা হয়েছিল ট্রেনের আদলে একটি বিশাল সেট। পরিচালক তানিম নূরের পরিকল্পনায় শিল্প নির্দেশক রাজীম আহমেদ কাঠ দিয়ে নিখুঁত অনুপাতে বগি বানিয়েছিলেন। জানালার বাইরে কৃত্রিম দৃশ্য, ভেতরে আলো, সিট, লাগেজ রাখার তাক—সবই বাস্তব ট্রেনের মতো। এমনকি দুলুনির অনুভূতি দিতে বসানো হয়েছিল স্প্রিং। এই সেট তৈরিতে ৪৫ জন কর্মী কাজ করেছিলেন টানা ২৬ দিন।
তবে শিল্প নির্দেশকরা বলছেন, এ ধরনের কাজ করতে গিয়ে নানা সংকটের মুখে পড়তে হয়। বড় সেট তৈরির জন্য উপযুক্ত জায়গা নেই। এফডিসির কয়েকটি ফ্লোর সচল থাকলেও বড় কাজের জন্য কেবল দুই নম্বর ফ্লোরই ব্যবহারযোগ্য। সেটি পেতে নির্মাতাদের অনেক সময় অনুরোধ করতে হয়, আবার চাপের মধ্যে কাজ শেষ করতে হয়।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্প নির্দেশক শিহাব নূরুন নবী জানান, বড় ফ্লোর না থাকা একটি বড় সমস্যা হলেও সবচেয়ে বড় সংকট হলো দক্ষ জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব। দেশে সেট ডিজাইন বা আর্ট ডিরেকশন শেখানোর মতো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। ফলে নতুন প্রযুক্তি বা বিশ্বে কী হচ্ছে তা জানতে নির্মাতাদের বেগ পেতে হয়। বাজেট সংকটও বড় বাধা। একটি বড় চলচ্চিত্রের শিল্প নির্দেশনায় অন্তত ৩০ লাখ টাকা দরকার হলেও বাস্তবে তার অর্ধেকও পাওয়া যায় না।
বিশ্বের অনেক দেশে চলচ্চিত্র শিল্প ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় বড় স্টুডিও কমপ্লেক্স। ভারতের হায়দরাবাদের রামোজি ফিল্ম সিটি কিংবা মুম্বাই ফিল্ম সিটিতে স্থায়ীভাবে নানা ধরনের সেট তৈরি করে রাখা হয়। নির্মাতারা প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো ভাড়া নিতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের অবকাঠামো নেই। এফডিসির ফ্লোর ও শুটিং স্পটগুলোও এখন অনেকটাই অচল হয়ে পড়েছে।
এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান তানি জানিয়েছেন, ফ্লোরগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পানি পড়া, এসি নষ্টসহ নানা সমস্যার সমাধান করতে বরাদ্দ প্রয়োজন। কবিরপুরে নির্মাণাধীন ফিল্ম সিটি শেষ হলে নতুন শুটিং ফ্লোর ও সেট ব্যবহারের সুযোগ মিলবে।
এদিকে বাণিজ্যিকভাবে স্টুডিও ভাড়া দেয় ‘স্টুডিও নাইন এন হাফ’। সেখানে আধুনিক সুবিধা থাকলেও ভাড়া বেশি হওয়ায় সিনেমার কাজ তুলনামূলক কম হয়।
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বড় বাজেটের সিনেমাগুলো ক্রমেই বিদেশে শুটিং করছে। ভারতের বারানসি, এলাহাবাদ, মুম্বাই, নেপাল, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কায় হচ্ছে দৃশ্যধারণ। নির্বাহী প্রযোজক সাব্বির আহমেদ সোহাগ বলেন, দেশে প্রয়োজনীয় প্রপস, ভিন্টেজ গাড়ি, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা দক্ষ টেকনিক্যাল ক্রু নেই। আবার বড় লোকেশন পাওয়া কঠিন। ফলে নির্মাতারা বিদেশে শুটিং করতে বাধ্য হন। বিদেশে আগে থেকেই হাসপাতাল, থানা, জেলখানা বা বাড়ির মতো স্থায়ী সেট থাকে। সামান্য পরিবর্তন করেই ব্যবহার করা যায়। এতে খরচ তুলনামূলক কম হয়, আবার দক্ষ ক্রু ও প্রযুক্তি সুবিধাও পাওয়া যায়।