বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থানকে কেবল বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফল এমন সরল ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। বাস্তবে, দেশের ভেতরে ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তিশালী সংগঠনিক কাঠামো, বিস্তৃত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক পরিকল্পনাও এই উত্থানের গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তারা জানে, সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা সহজ নয় বরং ছাত্র ও তরুণ সমাজকে ধীরে ধীরে প্রভাবিত করে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলানোই তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর কৌশল। সে কারণেই ইসলামী ছাত্র শিবিরের মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ ছাত্রসংগঠন কিংবা হিজবুত তাহরিরের মতো আদর্শিকভাবে কট্টর কিন্তু সংগঠিত গোষ্ঠীগুলোকে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে মুসলিম ব্রাদারহুড বা ইরানের ইসলামী বিপ্লব আমাদের স্পষ্ট শিক্ষা দেয়। সেখানে বিপ্লব হঠাৎ ঘটেনি; দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ছাত্ররাজনীতি, সামাজিক সংগঠন ও সাংস্কৃতিক পরিসরে আদর্শিক কাজ চালানো হয়েছে। বাংলাদেশেও যদি রাজনৈতিকভাবে সতর্ক না হওয়া যায়, তবে অনুরূপ বাস্তবতা তৈরি হওয়া অসম্ভব নয় বরং সম্ভাব্য।
বাংলাদেশে ইসলামী ছাত্র শিবির থেকে উঠে আসা নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে যদি কেবল আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয় এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মোকাবেলা করা না যায়, তবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। ইতিহাস আমাদের বারবার সতর্ক করেছে ছাত্ররাজনীতি কখনোই নিরীহ নয়। সঠিক আদর্শিক প্রস্তুতি, সংগঠন ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ছাত্রশক্তিই সবচেয়ে কার্যকর রাজনৈতিক রূপান্তরের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ফলে এই শক্তিকে ব্যাবহার করে কিছু ইসলামিক দেশ বাংলাদেশে তাদের এবং তাদের প্রভুদের সাম্রাজ্য বিস্তারের ফন্দি করছে।
বিশ্বরাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় তুরস্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। মধ্যপ্রাচ্যে ইজরায়েলের পর যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সমীকরণে তুরস্ক একটি বড় গুটি। এই দেশ একদিকে ন্যাটোর সদস্য, অন্যদিকে রাজনৈতিক ইসলামের নতুন মডেল রপ্তানিতে আগ্রহী। অতীতে যেভাবে আইএস-এর উত্থানের পেছনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ জড়িয়ে ছিল; তেমনি আজ দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোতেও রাজনৈতিক ইসলামের পুনর্গঠনের নীরব প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ এই সমীকরণের বাইরে নয় বরং তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান একে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো বাংলাদেশের দুই বৃহৎ রাজনৈতিক দলের পারস্পরিক বৈপরীত্য ও অবিশ্বাস। ক্ষমতার প্রশ্নে এই দ্বন্দ্ব আজ আর কেবল রাজনৈতিক নয়-এটি রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী রূপ নিয়েছে। একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করার এই রাজনীতির ফাঁকেই জামায়াতে ইসলামী, ছাত্র শিবির, হিজবুত তাহরির, হেফাজতসহ ডানপন্থি ইসলামী শক্তিগুলো বারবার নতুন সুযোগ পাচ্ছে। যখনই মূলধারার গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো বিভক্ত হয়েছে, তখনই মৌলবাদ শক্তিশালী হয়েছে।
এই বিভাজনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া। মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সাংবিধানিক গণতন্ত্র-এসব বিষয়ে ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে না পারলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে আদর্শহীন হয়ে পড়ে। আর আদর্শহীন রাষ্ট্রই মৌলবাদী শক্তির সবচেয়ে উর্বর জমি।
এখানেই সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রশ্নটি অনিবার্য হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক লড়াই কেবল সংসদ বা রাজপথে সীমাবদ্ধ নয়; এটি হয় পাঠ্যবইয়ে, চলচ্চিত্রে, সংগীতে, নাটকে, সাহিত্যে ও ইতিহাসচর্চায়। নতুন প্রজন্ম যদি মহান মুক্তিযুদ্ধকে না জানে, যদি ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের অর্থ অনুধাবন না করে, তবে তাদের সামনে বিকল্প ইতিহাস তুলে দেওয়া সহজ হয়ে যায়। মৌলবাদী রাজনীতি ঠিক এখানেই আঘাত হানে;ইতিহাস মুছে দিয়ে পরিচয়ের নতুন সংজ্ঞা দেয়। তাই মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের যথাযথ মূল্যায়ন, মানবিক ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক চর্চা এবং তরুণদের মধ্যে যুক্তিবাদী চিন্তার বিস্তার না ঘটাতে পারলে রাজনৈতিক ঐক্যও টেকসই হবে না।
অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এই তিন সময়কে একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি কথাই স্পষ্ট হয়- সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই। রাজনৈতিক বিভাজন যত দীর্ঘ হবে, মৌলবাদ তত গভীরে শিকড় গাড়বে। তাই প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় স্বার্থে ন্যূনতম রাজনৈতিক ঐক্য, সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা-এই দেশ তাদের, এই রাষ্ট্র তাদেরই পূর্বসূরিদের আত্মত্যাগের ফল। এই মূল্যায়ন যত দ্রুত এবং যত দৃঢ়ভাবে করা যাবে, বাংলাদেশের জন্য ততই মঙ্গল।