সর্বশেষ

ক্ষমতার অপব্যবহার

জেলা প্রশাসকের স্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসনের কমিটি ও পদ

সম্পাদকীয় বিডি ভয়েস
প্রকাশিত: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৯:৩০
ইংল্যান্ডে সচিব পদ সাধারণ হলেও ভারতীয় উপমহাদেশে তা অসীম ক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আজও ডিসিদের কাছে জনগণ ‘প্রজা’ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই জেলা প্রশাসক বা তাঁর স্ত্রী কমিটির প্রধান হলে তা আশ্চর্যের কিছু নয়। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায় যে জনপ্রশাসনে সংস্কার কবে হবে, আর স্থানীয় শাসনে নির্বাচিতদের প্রকৃত ক্ষমতা কবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
জেলা প্রশাসকের স্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসনের কমিটি ও পদ

সম্প্রতি গাইবান্ধায় জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা নিয়ে স্থানীয়ভাবে সমালোচনা তৈরি হয়। সেখানে আহ্বায়ক হয়েছেন জেলা প্রশাসকের (ডিসি) স্ত্রী। প্রশ্ন উঠেছে ডিসির স্ত্রী কীভাবে পদাধিকারবলে আহ্বায়ক হতে পারেন?

 

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভানেত্রী হবেন জেলা প্রশাসক কর্তৃক মনোনীত জেলার একজন নারী ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক ডিসি তাঁদের স্ত্রীকে এ পদে বসিয়েছেন। এতে স্থানীয় নারী ক্রীড়া ব্যক্তিত্বরা মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং ক্রীড়া ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার সুযোগ পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসকদের ক্ষমতাচর্চার নমুনাও প্রকাশ পাচ্ছে।

 

অতীতে ডিসিরা প্রশাসন ক্যাডারের জন্য পৃথক ব্যাংক, স্পেশাল ফোর্স, দিবস উদ্‌যাপনে কোটি টাকা বরাদ্দ, জ্বালানি তেল ব্যবহারের সীমা তুলে দেওয়া এবং ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা চেয়েছিলেন। এমনকি বিচারিক ক্ষমতা অর্জনেরও দাবি তুলেছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সর্বশেষ ডিসি সম্মেলনে তাঁরা এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের রাজনীতি বন্ধ করার প্রস্তাব দেন।  

 

সংবিধান বলছে, নির্বাচিতদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানের ওপর স্থানীয় শাসনের ভার থাকবে। কুদরত-ই-ইলাহি পনির মামলার ঐতিহাসিক রায়ে বলা হয়েছিল, প্রতিটি প্রশাসনিক একাংশ নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই চালাবেন। কিন্তু বাস্তবে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের সরিয়ে শিক্ষা কমিটিতে ইউএনওদের চেয়ারম্যান করার প্রস্তাব এসেছে। অথচ সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রশাসন, জনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা নির্বাচিতদের দায়িত্ব।

 

২০২০ সালে কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীন সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে মধ্যরাতে তুলে নিয়ে আসেন। তাঁর অপরাধ ছিল সরকারি জমি ডিসির নামে করার বিষয়টি সংবাদে প্রকাশ করা। এ ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা হয়। একইভাবে বিভিন্ন নিয়োগে অনিয়ম, সাংস্কৃতিক কর্মীদের চাকরিচ্যুতি, জমি বরাদ্দে বিতর্ক—এসব ঘটনায় ডিসিদের ক্ষমতার অপব্যবহার স্পষ্ট হয়েছে।  

 

একজন জেলা প্রশাসক প্রায় তিন শতাধিক কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ডিসিদের সভাপতিত্বে গঠিত কমিটিগুলোর হালনাগাদ তথ্য পাঠানোর নির্দেশনা থেকেই এ তথ্য জানা যায়। ফলে স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা কমে যায় এবং প্রশাসন কার্যত সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।  

 

ইংল্যান্ডে সচিব পদ সাধারণ হলেও ভারতীয় উপমহাদেশে তা অসীম ক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আজও ডিসিদের কাছে জনগণ ‘প্রজা’ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই জেলা প্রশাসক বা তাঁর স্ত্রী কমিটির প্রধান হলে তা আশ্চর্যের কিছু নয়। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায় যে জনপ্রশাসনে সংস্কার কবে হবে, আর স্থানীয় শাসনে নির্বাচিতদের প্রকৃত ক্ষমতা কবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

সব খবর