আহমদ ছফার উক্তিটি আজকাল পড়লে হাসি পায়, আবার সেই হাসির মধ্যেই কেমন একটা ভয় ঢুকে যায়—“মানুষ সাপও হইতে পারে, শেয়ালও হইতে পারে, পাখিও হইতে পারে। মানুষেরই বিভিন্ন চরিত্র নেয়ার ক্ষমতা আছে। বুঝছো, গ্রাম দেশে আগে সাপ আর শেয়াল পাওয়া যাইতো। এগুলা নাই এখন। কারণ সাপ, শেয়াল এরা মানুষ হিসাবে জন্মাইতে আরম্ভ করছে”।
ছফা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, হয়তো এই বাক্যের পর আরেক লাইন যোগ করতেন— ‘আর জন্মের পর এরা ফেসবুক লাইভে আসিয়া নিজেদের দেশপ্রেমিক বলিতেছে’।
একসময় গ্রামে সত্যিই সাপ-শেয়াল ছিল। মানুষ জানত সাপ দেখলে সাবধান হতে হয়, শেয়াল দেখলে মুরগি সামলাতে হয়। সমস্যা হতো না, কারণ প্রাণীগুলো প্রাণী হিসেবেই থাকত। কিন্তু এখনকার বিপদটা অন্য জায়গায়। এখন সাপ কামড়ায় না, স্ট্যাটাস দেয়। শেয়াল রাতের আঁধারে হাঁটে না, দিনের আলোয় বক্তৃতা দেয়। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল এরা সবাই নিজেদের ‘নির্যাতিত’ দাবি করে।
এই জায়গাতেই আহমদ ছফার সাথে এসে হাত মেলান নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি । ‘দ্যা প্রিন্স’-বইয়ে ম্যাকিয়াভেলি সোজাসাপটা বলেছিলেন-‘ক্ষমতায় থাকতে চাইলে শাসককে সিংহ আর শেয়াল দুটোই হতে হবে। নৈতিকতা? ওটা ভালো, যদি কাজে লাগে। না লাগলে পাশ কাটাও’। ইউরোপে এই বই একসময় নিষিদ্ধ হয়েছিল। কারণ, এই বই শাসক, পোপ ও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের নৈতিক দর্শনের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশে হলে সম্ভবত এটি পাঠ্যবই হয়ে যেত। অন্তত অলিখিতভাবে হলেও।
আগে-পরের বাংলাদেশের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, ম্যাকিয়াভেলি’র ছাত্রছাত্রীর অভাব নেই। জুলাই আন্দোলনের পর যে ‘নয়া বন্দোবস্ত’-এর কথা শোনা গিয়েছিল, বাস্তবে তার অনেকটাই দাঁড়িয়েছে—যার লাঠি,তার নীতি। কোথাও স্মৃতিফলক ভাঙা হচ্ছে ‘আবেগের বশে’, কোথাও মানুষকে পেটানো হচ্ছে ‘ভুল বোঝাবুঝির কারণে’, আর পরে ফেসবুকে লেখা হচ্ছে- ‘আমরা শান্তিপূর্ণ মানুষ’।
এ যেন এক অদ্ভুত দেশ। এখানে সবাই নীতির কথা বলে, কিন্তু নীতি কারও কাছে নেই। সবাই সংবিধানের কথা বলে কিন্তু সংবিধানটা যেন ছুটিতে গেছে। কেউ বলেন, “আইন নিজের হাতে তুলে নিতে হয়”, আবার কেউ বলেন, “পরিস্থিতি আমাদের বাধ্য করেছে”। ম্যাকিয়াভেলি হলে নিশ্চয়ই বলতেন-দারুণ! পরিস্থিতির দোহাই সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।
আহমদ ছফা এই জায়গাতেই ম্যাকিয়াভেলি’র উল্টো প্রান্তে দাঁড়ান। তিনি জানতেন, ক্ষমতার বাস্তবতা আছে, কিন্তু সেই বাস্তবতাকে স্বাভাবিক করে ফেললেই সর্বনাশ। ছফা’র ‘সাপ’ আর ‘শেয়াল’ আসলে সেইসব মানুষ, যারা পরিস্থিতির সুযোগে চরিত্র বদলায়—সকালবেলা বিপ্লবী, দুপুরে মধ্যপন্থী, রাতে নৈতিক অভিভাবক।
বাংলাদেশের বর্তমান নৈরাজ্যে সবচেয়ে করুণ চরিত্র হলো ছফার ‘পাখি’। এখন পাখিরা খুব সাবধানে উড়ে। বেশি উড়লে দেশদ্রোহী, কম উড়লে সুবিধাবাদী। পাখি যদি প্রশ্ন করে—এটা ঠিক হচ্ছে? তাহলে বলা হয়- এখন প্রশ্নের সময় না।
ম্যাকিয়াভেলি’র ‘দ্যা প্রিন্স’ হয়তো এই সমাজে খুব স্বস্তিতে থাকতেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো-আমরা কি প্রিন্স চাই, না মানুষ? আহমদ ছফা আমাদের সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নটাই করেছিলেন। তিনি জানতেন, শেয়াল দিয়ে দেশ চলে কিছুদিন, সাপ দিয়ে চলে ভয় দেখিয়ে। কিন্তু দেশ বাঁচে পাখিদের জন্য। যারা উড়তে জানে, আর উড়তে গিয়ে পড়ে গেলেও প্রশ্ন করা ছাড়ে না।
কিন্তু এখানেই ছফা’র ‘পাখি’ সবচেয়ে স্পষ্ট এবং সবচেয়ে বিপন্ন। কারণ, ছফার পাখি এখানে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি নয়, কোনো দলীয় পরিচয়ও না। পাখি হলো সেই অবস্থান, যেখানে নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক অবস্থান তৈরি করে এবং যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে মানুষ ক্ষমতার ভাষা শিখে ফেলে না বরং ক্ষমতার ভাষাকে প্রশ্ন করে। কিন্তু পাখি ক্ষমতার ভেতরে ঢোকে না। সে উপরে ওঠে। উপরে উঠে দেখে, মানে দূরত্ব বজায় রেখে বিচার করতে পারে। এই দূরত্বটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ যে দূরত্ব রাখে, সে হাততালি দেয় না। যে হাততালি দেয় না, তাকে সহ্য করা কঠিন।
তাই ,এখন পাখিরা সাবধানে উড়ে। কারণ, এখন আকাশে অনেক চেকপোস্ট। ফলে পাখির সামনে দুইটা পথ খোলা থাকে-শেয়াল হয়ে যাও অথবা একা হয়ে যাও। ছফা জানতেন, বেশিরভাগ মানুষ প্রথম পথটাই বেছে নেয়। তাই তিনি পাখিকে রোমান্টিক করে তোলেননি। তিনি জানতেন, পাখি হওয়া মানে একাকিত্ব মেনে নেওয়া।
পাখি কোনো তাৎক্ষণিক বিপ্লব ঘটায় না। কিন্তু সে ভাষা নষ্ট হতে দেয় না। যখন সবাই ‘পরিস্থিতি’ বলে খুন ঢাকে, পাখি তখন শব্দগুলো খুঁটিয়ে দেখে। যখন সবাই ‘আবেগ’ বলে ভাঙচুর জায়েজ করে, পাখি তখন প্রশ্ন তোলে-কার আবেগ? কার ক্ষতি? এই কাজটাই ক্ষমতার জন্য ভয়ংকর। কারণ, শেয়ালকে শেয়ালই বোঝে, সাপকে সাপই সামলায়। কিন্তু পাখি মানুষকে আয়নার সামনে দাঁড় করায়।
ম্যাকিয়াভেলি বলেছিলেন-ক্ষমতা ধরে রাখতে শেয়াল হও, সিংহ হও। ছফা বলেছিলেন-সাবধান, মানুষ হয়ে সাপ-শেয়াল হয়ে যেও না। আর এখানেই পাখির প্রয়োজন। কারণ, পাখি ক্ষমতা না পেলেও ক্ষমতার সীমা মনে করিয়ে দেয়। আর ইতিহাসের দীর্ঘ হিসাবে, সীমা মনে করিয়ে দেওয়াটাই সবচেয়ে বড় অবদান।
অন্যদিকে ইতিহাস কিন্তু খুব নিষ্ঠুর পরীক্ষক। সে শেষে হিসাব করে দেখে- কে শেয়াল ছিল? আর কে পাখি? মাঝখানে যারা ‘পরিস্থিতির কারণে’ সবকিছু মেনে নিয়েছিল, ইতিহাস তাদের আলাদা করে মনে রাখে না।
আহমদ ছফা সেটা জানতেন। তাই তিনি আগেই বলে গিয়েছিলেন-সাবধান, সাপরা মানুষ হয়ে গেছে। এই কারণেই ছফার ‘পাখি’ আজ হাস্যকর মনে হয়, আবার ভয়ংকরও। কারণ,পাখি’র সংখ্যা কমে গেলে দেশটা কেবল সাপ আর শেয়ালে’র হাতে পড়ে থাকে। আর ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করে না।