সর্বশেষ

মতামত

কাগজে সেবা, বাস্তবে লুটপাট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত

প্রকাশিত: ২৬ নভেম্বর ২০২৫, ২০:৫৬
কাগজে সেবা, বাস্তবে লুটপাট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত

স্বাস্থ্য খাত যে কোনো জাতির মানবিক অগ্রগতির প্রধান ভিত্তি। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নীরব এক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাগজে-কলমে বাজেট বাড়ছে, আধুনিক প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, যন্ত্রপাতি কেনার অঙ্গীকার শোনা যায় তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা তার পুরো বিপরীত। কাগজে সেবা, বাস্তবে লুটপাট; এটাই যেন আজকের স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে নির্মম সত্য। এবং এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুর্বল, অস্বচ্ছ ও জবাবদিহিহীন প্রশাসনিক কাঠামো।

 

টেন্ডার, সরবরাহ, নিয়োগ ও বদলি—সব ক্ষেত্রেই বহুদিন ধরে এক ধরনের অদৃশ্য দালালচক্র সক্রিয়। অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ইউনিটের অভ্যন্তরে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি ধাপকে ব্যবসায়িক লাভের উৎসে পরিণত করেছে। নথিতে বরাদ্দ যেমন থাকে, বাস্তবে তার বড় অংশই হারিয়ে যায় অস্বচ্ছ কমিশন, অনুমতি-বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট-চালিত সিদ্ধান্তে। যার ফলশ্রুতিতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত দেখা দেয় ওষুধ, স্যালাইন, গ্লাভস, ব্যান্ডেজ ও জরুরি সামগ্রীর সংকট।

 

মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকদের অভিযোগ, সরকারি বরাদ্দের ১৫–২০ শতাংশও রোগীসেবায় পৌঁছায় না। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে ফাইলে ফাইলে মাসের পর মাস ঘোরে, আর ‘অনুমতির ব্যবসা’ তৈরি হয়েছে আলাদা এক আয়ের উৎস হিসেবে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে একই কর্মকর্তার দীর্ঘদিন অবস্থানও প্রশ্ন তোলে যা বদলি-নীতির দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির অভাবের ইঙ্গিত বহন করে।

 

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিত্র আরও ভয়াবহ। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাজেট বছরের প্রথম কার্যদিবসেই অর্থনৈতিক কোড অনুযায়ী বরাদ্দ পৌঁছে যায়, কিন্তু বছর শেষে “জুন ক্লোজিং”–এর নামে হরিলুট প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ কর্মচারীরা জানেনই না তাদের নামে ভূয়া বিল ভাউচার তৈরি করে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। যমুনার ওপারের এক উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তো এমএসআর খাতের অতিরিক্ত বরাদ্দ হিসেবে প্রাপ্ত ২১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা ঠিকাদারের হিসেবে না গিয়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সঞ্চয়ী হিসাবে জমা হওয়ায় দুদকের নজরদারি শুরু হয়।

 

উত্তরের সীমান্তবর্তী আরেকটি জেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুদকের অভিযানে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ অনিয়ম। ওষুধ খাতে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ৭৫ শতাংশ এসেনশিয়াল ড্রাগস লিমিটেড থেকে ক্রয় বাধ্যতামূলক হলেও বহু প্রতিষ্ঠান নিয়মভঙ্গ করে উন্মুক্ত টেন্ডারে কেনাকাটা করছে। এমনকি একজন প্রধান সহকারীর বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার সম্পত্তির অভিযোগ উঠলেও বিভাগীয় পর্যায়ে দ্রুত বদলির মাধ্যমে বিষয়টি চাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়।

 

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ভিত্তি বর্তমানে ভেঙে পড়ার মুখে। উপজেলাগুলোতে ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, নিম্নমানের ডায়েট, ভুয়া বিল–ভাউচার ও সাব-সেন্টারের নামে অর্থ আত্মসাত এখন প্রায় স্বাভাবিক চিত্র। ফলে জনগণের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাই আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

 

স্বাস্থ্য সেক্টরকে বাঁচাতে তিনটি পদক্ষেপ জরুরি- স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা, বদলি-নীতির কঠোর প্রয়োগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীন ও বাধাহীন তদন্ত। প্রশাসনিক দুর্নীতির শিকড় না কাটলে বাজেট বাড়ালেই সেবা বাড়বে না বরং আরও শক্তিশালী হবে লুটপাটের চক্র।

 

স্বাস্থ্যখাতকে পুনরুদ্ধার করতে হলে কাগজের সেবাকে বাস্তবের সেবায় রূপান্তর করতেই হবে, এই মুহূর্তে এটাই জাতির প্রধান দাবি।

সব খবর