মৃত্যুশয্যায় খালেদা জিয়া অথচ মায়ের পাশে নেই একমাত্র সন্তান তারেক জিয়া। মা-সন্তানের ভালোবাসা চিরন্তন। কোন বাঁধনই এ বন্ধন ছিন্ন করতে পারে না। গত ১৫ বছর না হয় পারে নি, কিন্তু গত ১৫ মাস, এমনকি এই শেষ সময়েও কেন তিনি মায়ের পাশে নেই! এটাই এখন সারা দেশের টক অব দ্যা টাউন। এটি কি তার বিচক্ষণতা, নাকি সাহসহীনতা! কীসের এত ভয়।
খালেদা জিয়ার শরীরের অবস্থা একটাই নাজুক বিদেশে নেয়ার মত অবস্থা নেই। প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে বিএনপিসহ বিভিন্ন দল দেশবাসীর কাছে দোয়া চাচ্ছে। রাষ্ট্রপতিকে দিয়েও দোয়া চাওয়ানো হচ্ছে।
আবার আরেকদিকে কিছু নেতা বিগত দিনে আ’লীগ সরকারের অত্যাচার, স্লো পয়জনিং, চিকিৎসাহীনতা ইত্যাদি বিষয়ে অভিযোগ তুলে শেখ হাসিনাকে এক হাত নিচ্ছে। এনসিপি তো শেখ হাসিনার ফাঁসি না দেখে খালেদা জিয়াকে মরতে দিবে না! তারমানে চারিদিকে মরাকান্নাও শুরু হয়ে গেছে, কিন্তু সন্তানের বিকার নেই। তিনি একমাত্র সন্তান হয়েও পরিবার, দল ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে একটি যুক্তি দিয়ে মায়ের কাছে না ফেরার কারণ ব্যাখ্যা করছে। বলেছেন ‘একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়’! এদিকে সরকার বলছে তারেক জিয়ার দেশে ফেরায় কোন বিধি-নিষেধ নাই। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছে তারেক জিয়া দেশে আসতে চাইলে একদিনেই ট্রাভেলপাস ইস্যু করা সম্ভব। অথচ তিনি দেশে আসছেন না, জনগণ তাহলে কী ভেবে নিবে?
অনেকেই মনে করেছিল হয়তো মামলা বা আইনী কিছু জটিলতা এখনও রয়ে গেছে। সরকারেরর বিবৃতির পরে এটা স্পষ্ট দেশে ফিরতে তার এখন কোন আইনগত বাঁধা নেই।
২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা নেওয়া সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে দুর্নীতির অভিযোগে আটক হয় তারেক জিয়া। আঠারো মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মুক্তি পেয়ে, তার একসপ্তাহ পরেই ১১ই সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশে সপরিবারের ঢাকা ছেড়েছিলেন তিনি। তিনি আর রাজনীতি করবেন না বলে মুচলেকা দেওয়ায় দেশ ত্যাগের ছাড়পত্র পেয়েছিলেন। ২০১২ সালে তিনি বৃটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করেন।
ওয়ান এলেভেনে সরকারের দেয়া দুর্নীতির মামলার বাইরেও আ'লীগের আমলে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার আসামী হয় তারেক জিয়া। ৫ই আগস্টের পর সকল মামলা থেকেই তাকে অব্যহতি দেয়া হয়। কিন্তু তারপরেও তার কিসের এত ভয় ঘরে ফেরার?
বিএনপি'র দায়িত্বশীল একাধিক শীর্ষ নেতা বলেছিলেন তিনি নভেম্বরেই ফিরবেন। নভেম্বর ইজ কার্মিং বলে নেতা-কর্মীদের উল্লাস করতে দেখলাম। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় তার জন্য বুলেটপ্রুফ গাড়ি কেনা হয়েছে। তার অস্ত্রের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে। বাড়ির ডেকারেশন কমপ্লিট।
খালেদা জিয়া যেই অন্তিম শয্যায়, যখন একমাত্র সন্তানের পাশে থাকা সবচেয়ে জরুরী তখনই তিনি নানাবিধ কারণের ইঙ্গিত দিয়ে দেশে ফেরার অনিশ্চয়তার কথা জানালেন।
শুধু মায়ের পাশে থাকার জন্যই নয়, দেশ ও জাতির এমনতর ক্রান্তিকালে যেখানে নির্বাচন আসন্ন সেখানে দলের হাল ধরতে তারেক জিয়ার যথাদ্রুত দেশে ফেরা সবচেয়ে জরুরী। ইউনুসের সাথে দরকষাকষি করে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধ্বে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই মর্মে সরকারের যৌক্তিক সমালোচনাতেও মুখে কলপ এঁটেছে বিএনপি। অথচ তফসিল ঘোষণার ৩ মাস এখন আড়াই মাসে ঠেকেছে। তফসিল নিয়ে বিএনপি'র কোন তাড়াহুড়া নেই। নভেম্বরের তফসিল নাকি ডিসেম্বরের ২য় সপ্তাহে ঘোষণা করবে। বিএনপি চুপ। শুধু তফসিল নয় নির্বাচনও যদি পিছিয়ে দেয় বিএনপি এখন আর কোন তর্জন গর্জন করবে না। কেননা তফসিল ঘোষণার আগে তারেক জিয়ার ভোটার হতে হবে। সেজন্য তার দেশে ফেরার আগে তফসিল ঘোষণা নয়।
‘সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়’ বলতে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপকে বুঝাতে চেয়েছেন বলেই ধরা হয়। অনেকে বলছে আমেরিকা, ভারত বা পাকিস্তান তাকে ক্লিয়ারেন্স দিচ্ছে না। কেউ বলছেন সেনাবাহিনীর একটা অংশ চাচ্ছে না। সরকারের ভিতরেও হয়তো একটা অংশ চাচ্ছে না।
তারেক জিয়া বৃটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়গ্রহণকারী। তারমানে তার পাসপোর্ট নেই, স্যারেন্ডার করতে হয়েছে। দেশে ফিরতে হলে তার ট্রাভেল পাশ লাগবে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন তারেক জিয়া চাইলে একদিনেই ট্রাভেল পাশ ইস্যু করা সম্ভব। কিন্তু একবার দেশে ফিরলে কোনদিন বৃটেনে ঢুকতে পারবে না। তাই বলে তিনি দেশে ফিরবেন না?
আমার ধারণা এখানে মূল ডিসাইডিং ফ্যাক্টর জামাত। দিন যত যাবে বিএনপির জনপ্রিয়তা তত কমবে, জামাত শিবিরের বাড়বে। জনপ্রিয়তা যতই বাড়ুক জামাতের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার বাস্তবতা এখনও তৈরি হয় নি। আবার ড. ইউনুসের যে নিয়োগদাতা, তাদের দল এনসিপি- তারপ্রতিও সরকারেরর কৃতজ্ঞতাবোধ ও দায়বদ্ধতা আছে। ভোটের রাজনীতিতে এনসিপি এককভাবে নির্বাচন করলে সবকটিতে জামানত হারাবে। সুতরং জামাত এবং এনসিপিকে ক্ষমতার অংশ করতেই তারেক জিয়ার সাথে নেগোসিয়েশনের চেষ্টায় আছে সরকার। নির্বাচন পরবর্তি জাতীয় সরকার হোক বা কোয়ালিশন সরকার হোক যেকোনভাবেই জামাত-এনসিপির ক্ষমতার ভাগ নিশ্চিত না করা পর্যন্ত তারেক জিয়াকে দেশে ফিরতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে সরকার। ফলে সরকারই বিভিন্ন জুজু’র ভয় দেখাচ্ছে তারেক জিয়াকে। ৫ই আগস্টের পর তারেক জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে ম্যাচিউরড দেখালেও এই শেষ সময় এসে শুধু নিজের নিরাপত্তাটাই যদি মূখ্য হিসেবে জাতির সামনে তুলে ধরে সেটা বড়ই অপরিপক্কতা।
১০ ট্রাক অস্ত্র, ২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা, হাওয়া ভবন তৈরিসহ একাধিক অভিযোগের প্রমাণ থাকা সত্বেও দেশবাসী মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী দলকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না বলে তারেক জিয়ার উপর অনেকেই ভরসা করছে। দেশের ৫০ শতাংশ ভোটারকে বাইরে রেখে দখলাদার সরকার একপাক্ষিক নির্বাচনের মাধ্যমে যে গণতান্ত্রিক উত্তোরণের (!) পদক্ষেপ নিয়েছে সেই নির্বাচনে তারেক জিয়া যদি নেগোসিয়েশনে রাজী না হয়, তাহলে জামাতের নেতৃত্বেই পরবর্তি সরকার গঠনের আয়োজন ইউনূস গং করবে, সেটা ছলে বলে যে কৌশলেই হোক।