সর্বশেষ

রাজনৈতিক ব্যঙ্গ

লেবাসের লীলাখেলা: জামায়াতের জান্নাতি জিঙ্গেল

প্রকাশিত: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮:৩১
লেবাসের লীলাখেলা: জামায়াতের জান্নাতি জিঙ্গেল

বাংলাদেশে যখন ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা তাহাদের ঈমান রক্ষার্থে রোজা রাখেন, তাহাদের ভোট রক্ষার্থে জামায়াত রাখে ফতোয়া। এই দলটি ইসলামের ঝান্ডা হাতে ধরিয়া এমনভাবে হাঁটে, যেন তাহারা নবীজির উত্তরাধিকারী অথচ পেছনে লেবাসের পুটলি খুলিয়া স্বার্থের সিঁড়ি বানায়।

 

মৌসুমী পাখির মতোই এরা ভোটের মৌসুমে ফতোয়া পাল্টায়। গত নির্বাচনে পোস্টারে ছবি ব্যবহার হারাম ছিল, তাই প্রার্থীর মুখ ছিল অদৃশ্য। জনগণ ভাবিয়াছিল, জান্নাতের দরজা খুলিবে। কিন্তু এবার, জান্নাতি হাসি, চকচকে দাঁত আর ফটোশপে গড়া দাড়ির সৌন্দর্যে পোস্টার ঝলমল। ফতোয়া বদলাইয়াছে, কারণ ভোট বদলাইয়াছে। মোল্লারা বলিয়াছেন, “ছবি হারাম, যদি তা বিনোদনের জন্য হয়। কিন্তু যদি তা ভোটের জন্য হয়, তবে তা ইবাদতের সমতুল্য।”

 

গান-বাজনা শরীয়তে হারাম, কিন্তু নির্বাচনী মাঠে জিঙ্গেল বানাইয়া ভোট চাওয়াতে ছাড় আছে। কারণ মোল্লারা জানেন, ভোটারগণ এখন গান শুনিয়া ভোট দেন, কোরআন পড়িয়া নয়। তাই “জামায়াতকে ভোট দাও, জান্নাতে যাও”—এই সুরে বাঁশি বাজে আর মোল্লারা তাল দেন।

 

নারী নেতৃত্ব ইসলামে হারাম—এই কথা বলিয়া জামায়াত বহুদিন বিএনপি-আওয়ামী লীগের নেত্রীদের নেত্রী মানিয়া চলিয়াছে। কিন্তু এখন ক্ষমতার স্বাদে জিভে জল, তাই শরীয়ার নতুন ব্যাখ্যা হাজির। “নারী সংসদে গেলে ক্যাচাল করে, ঘরে থাকিলে শান্তি থাকে”—এই যুক্তিতে দল হইতে নারী প্রার্থী বাদ। মোল্লারা বলিয়াছেন, “নারী সংসদে গেলে সংসার ভাঙে, তাই সংসদে না পাঠাইলে সংসার বাঁচে।”

 

মোনাফেকির চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় যখন জামায়াত হিন্দুদের পূজায় গিয়া ঘোষণা দেয়—“রোজা পূজা সব জায়েজ।” একদিকে তাহারা বলেন, “শিরক হারাম”, অন্যদিকে পূজামণ্ডপে গিয়া বলেন, “ভগবান ও আল্লাহ এক।” এমন অনুপম সাম্প্রদায়িক মাধুর্য সম্রাট আকবরও তাহার দীন-ই-ইলাহিতে প্রতিষ্ঠা করিতে পারেন নাই।

 

এই সৌহার্দ্য এতই গভীর, যে জামায়াত এখন হিন্দু প্রার্থীও ঘোষণা করিয়াছে। দলটি বলিয়াছে, “জামায়াতকে ভোট দিলে মুসলিমরা জান্নাতে, হিন্দুরা স্বর্গে।” এমন ভোট-সর্বস্ব ধর্মতত্ত্বে ঈমান কাঁপে, কিন্তু ভোট বাড়ে। মোল্লারা বলিয়াছেন, “স্বার্থই শ্রেষ্ঠ ধর্ম আর ভোটই শ্রেষ্ঠ ইবাদত।”

 

জামায়াতের সৌন্দর্য লেবাসে। তাহারা যখন আন্দোলনে থাকেন, তখন লম্বা দাড়ি, টাখনুর উপরে পায়জামা, আর মুখে তসবিহ। কিন্তু যখন নির্বাচনে থাকেন, তখন দাড়ি ছাঁটা, পায়জামা নিচে আর মুখে জিঙ্গেল। তাহারা জানেন, জনগণ ধর্মে নয়, দামে ভোট দেয়। তাই লেবাস বদলাইয়া, ফতোয়া পাল্টাইয়া, গান গাইয়া, পূজা করিয়া, নারী বাদ দিয়া, হিন্দু প্রার্থী দিয়া—তাহারা ভোটের জান্নাত বানাইতেছেন।

 

এই দলটি এমন এক চমৎকার কৌশলে চলে, যাহা দেখে শয়তানও বলে, “ভাই, আমি তো এত পারি না।” তাহারা ধর্মের ব্যাখ্যা এমনভাবে দেন, যেন শরীয়ার মূল উৎস হইল নির্বাচনী ইশতেহার। তাহারা বলেন, “ইসলাম শান্তির ধর্ম, কিন্তু ভোটের সময় একটু হট্টগোল চলিবে।” তাহারা বলেন, “ইসলামে মিথ্যা হারাম, কিন্তু ভোটের সময় প্রতিশ্রুতি দেওয়া জায়েজ।”

 

তাই আসুন, আমরা আর প্রশ্ন না করি। বরং জামায়াতের এই লেবাস-নাট্য উপভোগ করি। তাহারা যখন জান্নাতের টিকিট বিলাইবেন, আমরা লাইন ধরিয়া দাঁড়াইব। কারণ জান্নাত এখন পোস্টারে, জিঙ্গেলে, পূজায় আর প্রার্থীর ছবিতে। আর শরীয়ার ব্যাখ্যা এখন মোল্লার মুখে নয়, ভোটের বাক্সে।

 

লেখক: এক ক্লান্ত পেনসিল - লেবাসের মুখোশে বিভ্রান্ত এক বঙ্গীয় সন্তান

সব খবর