সর্বশেষ

ভোটের মাঠে নারী কোথায়?

জুলাই চেতনা মানে যেন ‘নো উইমেন, নো ক্রাই’ গণতন্ত্র

প্রকাশিত: ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩:০২
জুলাই চেতনা মানে যেন ‘নো উইমেন, নো ক্রাই’ গণতন্ত্র

জুলাইয়ের সহিংসতায় নারীদের রাখা হয়েছিল সামনের সারিতে—রাস্তায়, মিছিলে, সংঘাতে। অথচ সেই তথাকথিত আন্দোলনের রাজনৈতিক ফলাফল হিসেবে যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসছে, সেখানে নারীরাই অদৃশ্য। যেন তাদের ব্যবহার করে স্বার্থোদ্ধারের পর ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে। প্রশ্নটা তাই অনিবার্য, ভোটের মাঠে নারী কোথায়? রাজনৈতিক দলগুলো কি জুলাইয়ে দেয়া আশ্বাস রেখেছে?

 

সংক্ষিপ্ত উত্তর হলোঃ না, প্রতারণা করেছে।
আর দীর্ঘ উত্তর আরও হতাশাজনক।

 

ইউনূস সরকারের উদ্যোগে প্রণীত জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে সরকার ঘনিষ্ট দলগুলো ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে অন্তত ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করে এসেছিল। পর্যায়ক্রমে ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার যে লক্ষ্যে ঠিক করা হয়েছে সেদিকে যাওয়ার একটি ন্যূনতম ধাপ হিসেবে এটিকে প্রচার করা হয়েছিল। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ দল সেই প্রতিশ্রুতিকে পাত্তাই দেয়নি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদারের ভাষায়, এটি সরাসরি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং এটি নাকি দলগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

 

সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকালেই চিত্র পরিষ্কার। বিএনপি সংখ্যার বিচারে এগিয়ে থাকলেও শত শত মনোনয়নপত্রের বিপরীতে মাত্র ১০ জন নারী প্রার্থী দিয়েছে। শতাংশের হিসাবে সেটি করুণ। অন্যদিকে বাসদ-মার্কসবাদী ব্যতিক্রম তারা এক তৃতীয়াংশ নারী প্রার্থী দিয়েছে, যদিও তাদের সংখ্যাই এতো নগণ্য যে তা ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না।

 

কিন্তু সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বিষয়টি অন্য জায়গায়—ইসলামপন্থি রাজনীতি।
 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সহ ইসলামপন্থি দল ও তাদের রাজনৈতিক বলয় থেকে একজন নারী প্রার্থীও নেই। শূন্য। গোল শূন্য।

 

এখানেই কিংবদন্তি শিল্পী বব মার্লের নিজের জীবনের নারীদের না কাঁদার আহ্বান জানিয়ে লেখা সেই বিখ্যাত গানের লাইন ‘নো উইমেন, নো ক্রাই’ এর সাম্প্রতিক প্রচলিত ব্যঙ্গরূপ অনিবার্য হয়ে ওঠে— নারী নেই তো কান্না নেই!
কাঁদার কিছু নেই, কারণ তারা কখনোই নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে কাঁদেনি।

 

যারা সমাজ, নৈতিকতা, রাষ্ট্র সংস্কার আর ‘ইসলামি আদর্শ’-এর কথা বলেন, তারা কি একবারও ভেবেছেন, এই সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা থেকে বাদ দেওয়া কতটা আদর্শিক? ইসলামপন্থি দলগুলোর কাছে নারী মানে ভোটার—প্রার্থী নয়; সমর্থক—নেত্রী নয়; প্রতীক—ক্ষমতার অংশীদার নয়।

 

এটি কেবল রাজনৈতিক অনীহা নয়, এটি গভীর মতাদর্শিক সমস্যা।
 

নারীকে ঘরের ভেতর সীমাবদ্ধ রাখার রাজনীতি সংসদের দরজায় এসে থেমে যায়নি বরং সেখানেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।

 

সমস্যা শুধু ইসলামপন্থিদের নয়। ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তত ৩০টি দল একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি। অর্থাৎ, নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এখনো দলগুলোর কাছে ‘অপশনাল’। আর সংরক্ষিত আসনের আরামদায়ক ব্যবস্থাটা আছে বলেই তারা দায় সেরেছে। সরাসরি ভোটে নারী প্রার্থী না দিলেও সমস্যা নেই, পরে দলীয় কোটা থেকেই ‘মনোনীত নারী’ আসবে, এই হলো ভাবনা।

 

কিন্তু সংরক্ষিত আসন কখনোই বিকল্প নয়, এটি ছিল অস্থায়ী ব্যবস্থা। সেটিকে স্থায়ী অজুহাতে পরিণত করা হয়েছে।

 

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম ঠিকই বলেছেন, নারী নেতৃত্বকে সামনে আনার ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর অগ্রগতি শুধু হতাশাজনক নয়, অগ্রহণযোগ্য। মনোনয়নের যে ‘প্যাটার্ন’ দেখা যাচ্ছে, তাতে বোঝা যায় নারীকে রাজনৈতিকভাবে সক্ষম করে তোলার কোনো আন্তরিক পরিকল্পনাই নেই।

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— কথায় কথায় জুলাই চেতনার কথা যে বলে তা সে জুলাই চেতনা তাহলে কী এবং কার জন্য?
 

নির্বাচনী মাঠে নারীর অনুপস্থিতি কেবল দলীয় অনীহার ফল নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সংস্কার উদ্যোগের ভণ্ডামিকেও নগ্ন করে দেয়। নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের অভিজ্ঞতাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। নারীর অধিকার ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারের নামে গঠিত এই কমিশন বাস্তবে ছিল একটি নিরাপদ ‘ডেকোরেশন’—যার সুপারিশগুলো প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই ইসলামপন্থি চাপের মুখে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। বিবাহ, উত্তরাধিকার কিংবা পারিবারিক আইনের মতো মৌলিক প্রশ্নে কমিশন সরকারকে কোনো সাহসী অবস্থানে নিতে পারেনি। ফলে স্পষ্ট হয়ে যায়, নারী প্রশ্নে রাষ্ট্র নিজেই আপসকামী ও ভীত। সংসদে নারী প্রার্থী না থাকা আর নারী সংস্কার কমিশনের ব্যর্থতা একই সুতোয় গাঁথা—দুটোই দেখায়, এই ‘জুলাই চেতনা’ আসলে নারীবিহীন গণতন্ত্রেরই আরেক নাম।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলেছেন, জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী তবু আড়াই হাজার মনোনয়নের মধ্যে শতাধিক নারীও নেই। এটি কেবল সংখ্যার ব্যর্থতা নয়; এটি রাজনৈতিক কল্পনাশক্তির দৈন্য।

 

আর ইসলামপন্থি দলগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট যে তারা ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে, সেটির একটি পরিষ্কার ছবি দিচ্ছে। সেই ছবিতে নারী নেই। অথবা থাকলেও নীরব, অদৃশ্য, সিদ্ধান্তহীন।

 

তাই আবারও বলতে হয়—নো উইমেন, নো ক্রাই!
 

তারা কাঁদবে না, কারণ এই অনুপস্থিতি তাদের কাছে কোনো সংকট নয়। সংকট তাদের যারা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কল্পনা করে মিথ্যে প্রলোভনে পড়ে রাষ্ট্রক্ষমতা তুলে দিয়েছে মৌলবাদি শক্তির হাতে।

 

এই নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরীক্ষাও। আর সেই পরীক্ষায় নারী প্রশ্নে অধিকাংশ দল এখন পর্যন্ত ফেল করেছে।
জুলাইয়ের দাঙ্গায় নারীদের সামনে ঠেলে দিলেও, সংসদের বেঞ্চে তাদের বসতে দেয়া যায় না কেন?

 

এই প্রশ্নের উত্তর না আসা পর্যন্ত, ত্রয়োদশ সংসদ নিয়ে করা সব গণতান্ত্রিক দাবি অপূর্ণই থেকে যাবে।

সব খবর