১
বাংলায় একটা কথা প্রচলিত আছে, গরু মেরে জুতো দান। হঠাৎ করে কেন একথার অবতারণা করছি! করছি একারণে যে, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের আয়োজনে ১৯৬৪-৬৫ সাল থেকে শুরু হয়ে পরবর্তীতে বাংলা একাডেমীতে তত্ত্বাবধানে হতে থাকা বইমেলা ফেব্রুয়ারির এক তারিখ থেকে শুরু হয়ে চলত শেষ দিন পর্যন্ত। দেশে নানা দুর্যোগ, প্রাকৃতিক অচলাবস্থা, সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অস্থিরতে, রোজা-পার্বণ এমনকি বিশেষ দিন পর্যন্ত বইমেলা তার নিজস্ব নিয়মে হয়ে এসেছে- কখনো এ নিয়মের ব্যত্যয় হয়নি। শাসকেরা বইমেলাকে আলাদা করে দেখেন নি। তারা মনে করেছেন, এটি বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ- একে তার স্থানে রেখেই সবকিছু করা উচিত।
নির্বাচনকে সামনে রেখে শুরু থেকে সংশ্লিষ্টরা বইমেলা নিয়ে একটি অনিশ্চয়তার বাতাবরণ তৈরি করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে থাকল। তাদের পক্ষ থেকে প্রথমে ডিসেম্বরে বইমেলা করার কথা বলা হলে সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি, পুস্তক বিক্রেতা সমিতি, লেখকদের তীব্র আপত্তির মুখে দফায় দফায় কালক্ষেপণ করে নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয় ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ থেকে মার্চের ১৫ পর্যন্ত।
জানা গেছে, একাডেমীর এই সময়সীমা নিয়ে প্রকাশক- পুস্তক বিক্রেতা সমিতির বিভিন্ন অংশের মতবিরোধ রয়েছে। রাজনৈতিক কারণে চব্বিশের আগস্ট পরবর্তী সময়ে বঞ্চিত ও সুবিধাপ্রাপ্ত প্রকাশকদের মধ্যে একাধিক পক্ষ- বিপক্ষ দাঁড়িয়ে গেছে। তারা তাদের আদর্শ ও দলীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখিয়ে বইমেলায় নিজেদের আধিপত্য দেখাতে মরিয়া হয়ে মেলাকে প্রভাবিত করছে। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার জোর দেখিয়ে নতুন প্রকাশক নেতারা প্রকাশকদের প্রভাবশালী অংশকে কার্যত মেলার বাইরে রেখে মেলার আয়োজন করছে। কেউ কেউ মেলায় নামকা ওয়াস্তে অংশগ্রহণ করছে।
২
নির্বাচনের অজুহাতে বইমেলা পিছিয়ে দেয়ার বাংলা একাডেমীর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে প্রকাশক- লেখকরা একাডেমী চত্বরে পহেলা ফেব্রুয়ারি আয়োজন করেছে প্রতীকী বইমেলার। এরকম প্রতীকী বইমেলার নজির দেশের বইপ্রেমি মানুষ এর আগে কখনো দেখেনি। প্রতীকী এ বইমেলার উদ্বোধন করেন একাডেমীর সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ও প্রবীণ বাম নেত্রী দীপা দত্ত। একাডেমী সভাপতির বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় মেলা নিয়ে তার প্রতিষ্ঠানের অবস্থান। তিনি বক্তব্যে 'নির্বাচনের কারণে বইমেলা কিছুটা পিছিয়ে দেয়ায় ভাষা ও সাহিত্যপ্রেমীদের ভেতরে একটি আক্ষেপ রয়ে গেছে। সেই আক্ষেপ থেকেই এই প্রতীকী বইমেলা।'
বাংলা একাডেমী সভাপতির এই বক্তব্যকে ঘিরে লেখক-কবি- সংস্কৃতিসহ সব মহলে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। তারা তার এই বক্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন উল্লেখ করে জানান, যেখানে সবসময় ১ তারিখ থেকে মেলা শুরু হয় সেখানে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়াকে তিনি বলছেন কিছুটা পিছিয়ে দেয়া হয়েছে? একদিকে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ২০ দিন পরে মেলা শুরু অন্যদিকে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে একাডেমী চত্বরে প্রকাশকদের প্রতীকী বইমেলার উদ্বোধন করে বাংলা একাডেমী সভাপতি কি প্রকারান্তরে 'গরু মেরে জুতো দান' করলেন কিনা সংশ্লিষ্টরা সে প্রশ্ন এখন ঘুরে ফিরে করছেন।
৩
প্রতীকী বইমেলা আর ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বইমেলা- এ দুয়ের ভেতর দিয়ে দেশে এই প্রথমবারের মতো একুশে বইমেলা পেল এক ভিন্ন চেহারা যে চেহারার সাথে সাধারণ বইপ্রেমিরা পরিচিত নন।