দক্ষিণ এশিয়ায় ‘ইসলাম’ বিস্তারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারাটি ছিল ‘সূফিবাদ’ যেখানে ধর্ম কেবল বিধান নয় বরং নৈতিকতা, মানবিকতা, সমতা ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক বহমান তরীকা। অথচ এই ‘সূফি’ ঐতিহ্যই বারবার আক্রমণের শিকার হয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তানি রাষ্ট্রনীতি থেকে শুরু করে সমসাময়িক বাংলাদেশের নানা প্রান্তে। প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে-কেন সুফিবাদকে বারবার দমনের নিশানা বানানো হয়?
সূফি খানকা শরীফ, মাজার শরীফ, আশ্রম সব জায়গাতেই গড়ে উঠেছিল রাষ্ট্রের বাইরে এক ধরনের ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব। এই নেতৃত্ব ছিল স্থানীয়, সাংস্কৃতিক ও জনগণের আস্থাভাজন। তাদের আচার-অনুশীলন ছিল আদাব, ইহসান, লোকায়ত সংগীত, কবিতা, সমতা ও মানবিকতার ওপর দাঁড়িয়ে। তাই ব্রিটিশ শাসকদের চোখে সুফিবাদ ছিল এক ‘নিয়ন্ত্রণহীন প্রভাবকেন্দ্র’, যা তাদের রাজনৈতিক শাসনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে এমন সন্দেহ থেকেই নজরদারি, দমন ও বদনামের ধারাবাহিকতা সেই থেকে শুরু।
এই আশঙ্কা পাকিস্তান আমলেও অব্যাহত থাকে। পাকিস্তানি রাষ্ট্র গঠনের পর ধর্মীয় পরিচয়কে একরৈখিক করার প্রয়াস সুফিবাদের বৈচিত্র্যময় স্বভাবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। বাংলার সূফি সংস্কৃতি গান, কবিতা, লোকধর্ম, মানবিকতা পাকিস্তানি সামরিক রাষ্ট্রের চোখে ছিল বাঙালি পরিচয়ের সাংস্কৃতিক শক্তি। তাই ‘সূফি’ ঐতিহ্যকে কখনো ‘বিদআত’, কখনো ‘গোমরাহি’, কখনো ‘কুসংস্কার’ আখ্যা দিয়ে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়।
ধর্মীয় রক্ষণশীলতার সঙ্গে সূফিবাদের দ্বন্দ্বও দীর্ঘদিনের। কারণ সূফিরা ধর্মীয় কাঠামোর ভেতর নতুন মাশরাব, নতুন ব্যাখ্যার জায়গা তৈরি করেছিলেন। কঠোর বিধানমুখী ব্যাখ্যার বিপরীতে সূফিবাদে ছিল সংগীত, নৃত্য, কবিতা, প্রেম ও রূহানিয়ত যা বহু ইসলামী চিন্তাবিদকে ইতিহাস জুড়ে অভিযুক্ত করেছে। মানসুর আল-হাল্লাজ থেকে দারা শিকোহ কারও ওপর রাষ্ট্রীয় ক্রোধ, কারও ওপর মতাদর্শিক আক্রমণ। এমনকি ইবনে সিনা যুক্তিনির্ভর দর্শনের জন্য ‘নাস্তিক’ উপাধি পান, মাওলানা রুমি প্রেমকেন্দ্রিক চিন্তার জন্য হন ‘বিধর্মী’, আল্লামা ইকবাল সমালোচিত হন ‘অতিরিক্ত উদার’ হওয়ার অভিযোগে। মূল বিষয়টি হলো তাঁরা প্রথাবদ্ধ কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে ইসলামকে দেখেছেন, হিকমত দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন।
আজকের বাংলাদেশেও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। একদিকে সূফিবাদ সংস্কৃতি সমন্বিত মানবিক ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে; অন্যদিকে ইসলামী মৌলবাদী রাজনীতির চোখে এটি বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ। কারণ সূফিবাদ বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেয়, ভাষা–সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে না, মানুষের স্বাধীন চিন্তার জায়গা তৈরি করে। যা একমুখী রাষ্ট্রীয় ধর্মনীতির সঙ্গে মেলে না।
বাংলার আত্মপরিচয়ের এক বড় অংশ গড়ে উঠেছে ‘সূফি’ ঐতিহ্যের ওপর। এই দেশে লালন সাঁই, শাহ আবদুল করিম, মাইজভাণ্ডারী, জারি-সারি, পালাগান, বাউল দর্শন সবকিছু মিলেই এক সাংস্কৃতিক মাশায়েখি। এই ধারা বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার ভিত নির্মাণ করেছে।
আর এটাই ইসলামী চরমপন্থার কাছে বিপজ্জনক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে সূফি খানকা শরীফ, অলিদের মাজার, লোকসংস্কৃতিকে লক্ষ্য করে হামলার যে ধারাবাহিকতা (সাহেবনগর, সিলেট, সাতক্ষীরা, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে সূফি–সম্পর্কিত হত্যাকাণ্ড) তাতে দেখা যাচ্ছে দ্বন্দ্বটি ধর্মতাত্ত্বিক নয়; এটি মূলত সাংস্কৃতিক আধিপত্যের যুদ্ধ। যেখানে মৌলবাদী গোষ্ঠীর লক্ষ্য কঠোর, একরৈখিক, রাষ্ট্র সমর্থিত ইসলামের প্রতিষ্ঠা; সেখানে সূফিবাদ দাঁড়ায় বহুস্তরীয়, দয়ালু, মানবিক ও সাংস্কৃতিক ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে।
নতুন বাস্তবতায় আরও একটি বিষয় যুক্ত হয়েছে মাজার কেন্দ্রিক অর্থনীতি, দানব্যবস্থা, স্থানীয় রাজনীতি। অনেক খানকা স্থানীয় প্রভাব বৃদ্ধি করেছে। এতে ধর্মনীতি ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে। কিছু রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের পক্ষে ‘ধর্মীয় বৈধতা’ সৃষ্টির প্রয়োজনে মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তুলে ‘সূফি’ ঐতিহ্যের ভিত্তি দুর্বল করার পথ বেছে নিয়েছে।
সুতরাং সূফিবাদের বিরুদ্ধে দমন কোনো ধর্মতাত্ত্বিক বিরোধ নয়; এটি ক্ষমতা, রাজনীতি ও ফিকিরের স্বাধীনতা’র প্রশ্ন। রাষ্ট্র যখন ধর্মকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার বানায়, তখন সূফিবাদের উদার, মানবিক ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাকে ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখা হয়।
সূফিবাদ কোনো গোঁড়ামির ধারক নয় বরং এটি প্রশ্ন করে, অনুভব করে, মানুষের ভেতরের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলে; এটাই এর বিবর্তনমূলক শক্তি যা কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রনীতি সহ্য করতে পারে না। কারণ প্রশ্ন করা, চিন্তা করা এবং দিলের আজাদি—সবসময়ই ক্ষমতার বিরুদ্ধে যায়।
অতএব সূফিবাদের ওপর আক্রমণ শুধু একটি ধারার বিরুদ্ধে নয়; এটি মানবিক, বহুস্তরীয় ইসলামকে দুর্বল করা এবং বৃহত্তর অর্থে বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর আঘাত। যে বাংলাদেশ মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছে, সেই রাষ্ট্রে সূফিবাদের ওপর সহিংসতা একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।
ইতিহাস বলে, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ, সংস্কৃতিনির্ভর ও মানবিক ইসলাম গড়ে উঠেছে এই সূফি ঐতিহ্যের হাত ধরেই। এটিকে দুর্বল করা মানে নিজের সাংস্কৃতিক শক্তিকে দুর্বল করা। ভাবুন তো এই বাংলাদেশ যেখানে কবিগান নেই, পালাগান নেই, ওরশ নেই, বাউল নেই!
অতএব প্রশ্নটি এখন শুধু ধর্মীয় নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ পরিচয় সংকটের প্রশ্ন। বাংলাদেশ কি তার বহুস্বরিক, সাংস্কৃতিক ইসলামকে রক্ষা করবে না কি একরৈখিক ব্যাখ্যার কাছে সেই ঐতিহ্য বিলীন হবে? সিদ্ধান্তটি নির্ধারিত হবে আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক প্রজ্ঞার মধ্য দিয়ে।