সর্বশেষ

সঙ-সদ

গণতন্ত্রের চড়ুইভাতি ও একবিংশ শতাব্দীর মহাহাস্যকর মহড়া

প্রকাশিত: ১৪ মার্চ ২০২৬, ০০:০৫
গণতন্ত্রের চড়ুইভাতি ও একবিংশ শতাব্দীর মহাহাস্যকর মহড়া

বঙ্গদেশের পবিত্র সংসদ ভবন আজ আর নীতি-নির্ধারণের তপোবন নাই; উহা এখন এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ ‘স্ট্যান্ড-আপ কমেডি’র রঙ্গমঞ্চে রূপান্তরিত হইয়াছে। যাহাকে এককালে জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক বলিয়া গণ্য করা হইত, তথায় এখন দিবালোকে ‘সঙ-যাত্রা’র মহড়া চলিতেছে। ইহা যেন কোনো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নহে, বরং জি-বাংলার ‘মিরাক্কেল’ অনুষ্ঠানের এক বিশেষ রাষ্ট্রীয় সংস্করণ।

 

ভারতের মীর আফসার আলী আজ গভীর উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করিতেছেন। তাঁহার হাস্যরসের সাম্রাজ্য আজ হুমকির মুখে। গবেষণা দল জানাইতেছে, পশ্চিমবঙ্গ হইতে ভাড়াটে ভাঁড় ডাকিয়া আর লাভ নাই; বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের সংসলাপে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক কৌতুক রহিয়াছে, তাহা মীর সাহেব কল্পনাও করিতে পারেন নাই। স্পন্সররা এখন হাহাকার করিতেছে—তাহারা ‘হাবা হাসমত’ কিংবা ‘গোস্ত মাসুদ’কে চায় না; তাহারা চায় সংসদ টিভি হইতে লাইভ টেলিকাস্ট। কারণ তথায় স্ক্রিপ্ট ছাড়াই যে প্রহসন মঞ্চস্থ হয়, তাহা দেখিয়া দর্শক হাসিতে হাসিতে মূর্ছা যায়।

 

যেই মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্নাত ইতিহাস এই দেশের ভিত্তি, সেই ইতিহাসের চরম বিরুদ্ধাচরণকারীরা আজ সংসদের উচ্চাসনে উপবিষ্ট। বিস্ময়ের সীমা থাকে না যখন দেখা যায়, মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রয়াণে মহান সংসদে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। যেন কুখ্যাত অপরাধই আজ রাষ্ট্রীয় গৌরবের মাপকাঠি! যাহারা ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিবার যোগ্য, তাহারা আজ সংসদের ‘উপনেতা’ সাজিয়া নীতি-নৈতিকতার তুবড়ি ফুটাইতেছেন। ইহা যেন এক বীভৎস উপহাস, যেখানে ফাঁসির দড়িকে অলঙ্কার বলিয়া ভ্রম হয়।

 

সংসদ কক্ষে যখন জাতীয় সংগীতের পবিত্র সুর ধ্বনিত হয়, তখন দৃশ্যপট আরও করুণ হইয়া উঠে। কেহ গোঁয়ারের ন্যায় আস্বাদন করিয়া বসিয়া থাকেন—যাহাকে তাহারা ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ বলিয়া অপব্যাখ্যা দেন। আবার কেহ দাঁড়াইবেন কি বসিয়া থাকিবেন, সেই দ্বিধায় হুড়াহুড়ি করিয়া একাকার করেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণ চলাকালীন যে পরিমাণ অবজ্ঞা প্রদর্শিত হয়, তাহাতে প্রতীয়মান হয় যে, রাষ্ট্রের শীর্ষপদটি আজ এক লঘু কৌতুকের বিষয়ে পরিণত হইয়াছে।

 

প্রশ্নোত্তর পর্বের নামে যে ভাঁড়ামি চলে, তাহা আধুনিক ইতিহাসের এক বিচিত্র অধ্যায়। সংসদীয় এলাকা কর্দমাক্ত ও অনুন্নত হইলেও মাননীয় মন্ত্রীরা অম্লানবদনে বলেন, “বাস্তবে রাস্তা না থাকিলে কী হইয়াছে? ফেসবুকের দেওয়ালে তো চকমকে রাস্তার ছবি রহিয়াছে!” দুর্নীতি আজ আর ব্যাধি নহে, বরং উন্নয়নের ‘তেল’ হিসেবে স্বীকৃত। সরকার যেন এক বিশাল হাড়ি-পাতিল লইয়া মাঠের মাঝখানে চড়ুইভাতি করিতে বসিয়াছে। তাহারা বলিতেছে, “আজ আমরা গণতন্ত্র-গণতন্ত্র খেলিব।” স্পিকার মহোদয় তখন নির্দেশ দিতেছেন— “এই দৃশ্যটি ঠিকমতো ফুটে নাই, হাসির পরিমাণ বৃদ্ধি করিয়া পুনরায় রিটেক লউন!”

 

বাজেট পেশের সময় মনে হয় ইহা কোনো রাষ্ট্রীয় দলিল নহে, বরং সার্কাস পরিচালনার ব্যয়তালিকা।

চড়ুইভাতি প্রকল্প: ৫০০ কোটি টাকা।

সাংসদদের কৌতুক প্রশিক্ষণ: ২০০ কোটি টাকা।

মিরাক্কেল উন্নয়ন তহবিল: ১০০০ কোটি টাকা।

 

আইন পাস হইতেছে ঝড়ের গতিতে—যাহারা অপরাধী তাহারাই হইবে ‘নৈতিকতার আলোকবর্তিকা’, আর যাহারা প্রতিবাদী তাহারা হইবে ‘উন্নয়ন বিরোধী’।

 

দেশ আজ খেলার পাত্রে পরিণত হইয়াছে। সরকার চড়ুইভাতির আয়োজক, আর হতভাগা জনগণ হইল সেই দর্শক—যাহারা আসলে যন্ত্রণায় কাঁদিতেছে, কিন্তু বাহিরে হাসিতে হাসিতে কুটি কুটি হইতেছে। যদি সত্যিই মীর সাহেব চাকরি হারান এবং সংসদ ভবনটি স্থায়ীভাবে ‘ন্যাশনাল কমেডি ক্লাবে’ রূপান্তরিত হয়, তবেই বুঝিবেন—বাংলাদেশ সত্যিই এক ‘অবিশ্বাস্য’ উচ্চতায় আরোহণ করিয়াছে। বিধাতা এই সঙ-সদকে দীর্ঘজীবী করুন, যেন জগতবাসী অন্তত বিনোদনের অভাবে না ভোগে।

 

লেখকঃ এক ক্লান্ত পেনসিল, রম্যের তামাশায় হতবিহ্বল

সব খবর