বহুদিন ধরিয়া আমরা শুনিতেছি সায়েন্স ফিকশনের পাতায় যে সুপারম্যানরা আকাশে উড়িয়া যায়, গ্রহরক্ষক হইয়া মানুষের বিপদে ঝাঁপায়, তারা এখন আমাদেরই মাঝে, বাংলাদেশেই নামিয়া আসিয়াছে। কাহিনীটা এতই বিস্ময়কর, যে সাধু ভাষায় বলিতে গেলে মনে হয় এ যেন ঈশ্বরেরই কৌতুক; আর আমরা সবাই সেই কৌতুকের দর্শক, কৃতজ্ঞতাসহকরে হাততালি দিই।
প্রথমত, এই সুপারম্যানরা কেবল সুপার নয় তাহারা তিন শ্রেণীর: এলিয়েনবাহিনী, মিউট্যান্ট কমিউনিটি এবং প্রিডেটর। এলিয়েনবাহিনী আসে মহাকাশযানসহ, কিন্তু বিমানবন্দর ছাড়াই ডাইরেক্ট ঢাকায় অবতরণ করে; মিউট্যান্টরা জন্মগতভাবে অদ্ভুত ক্ষমতাসম্পন্ন, চাইলেই মানুষকে বান মারিয়া অদৃশ্য করিয়া দেয়, চাইলেই নিজেরা অদৃশ্য হইয়া যায়, গুপ্ত হইয়া যায়; আর প্রিডেটররা—উহারা আসলে ‘প্রিডিক্টিভ লিডার’—ভবিষ্যৎ জানে, তাই নির্বাচনে জিতিবার নানান কৌশলেও সিদ্ধহস্ত।
তাহাদের ক্ষমতা শুনিলে মানুষের মন ভরিয়া যায় বিস্ময়ে। কেউ বলে, এক জন সুপারম্যান সূর্যকে দাঁড় করাইয়া দিল, সকালের আলো থামিয়া গেল, মানুষ ভাবিলো আজ রবিবার নাকি? কেউ বলে, আরেকজন মানুষকে বেহেশতে নিয়ে গেল কিন্তু ফিরিয়া আসিয়া বলিল, বেহেশতটা একটু ব্যস্ত, লাইনে দাঁড়াইতে হয়। তাতে আমরা হাসি, কাঁদি আর হতবাক হই।
আর সবচেয়ে আশ্চর্য, কিছু লোক দাবি করে, আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং তাহাদের জন্য পৃথিবীতে নামিয়া আসিয়াছে। এ কথা শুনিলে গ্রামের বুড়ো-বুড়ি বলিয়া ওঠে, “এখন তো কোরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা বদলাইয়া যাইবে!” শহরের তরুণেরা বলে, “ওটা কি রিয়েলিটি শো নাকি?” আর মিডিয়া? মিডিয়া তো খুশিতে নাচে; শিরোনাম করে, ‘আল্লাহ নামিয়া আসিলেন, সুপারম্যানদের সঙ্গে কফি সেশন’ পড়িলে মনে হয়, সংবাদ না নাটক, বোঝা যায় না।
এই সুপারম্যানদের আরেকটি গুণ আছে। তাহারা নির্বাচনে জিতায় বিশেষ পারদর্শী। রুহানী শক্তির মাধ্যমে দলকে বিজয়ী করিয়া দেয়। কেহ বলে, ভোটের ব্যালটই বদলে দেয়; কেহ বলে, মানুষদের মনে এমন এক আবেগ জাগাইয়া তোলে যে ভোট দিতে গিয়া সবাই ভুলে যায় কাহাকে দিতেছে। ফলে নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়া আমরা ধন্য ও কৃতজ্ঞ হই। কারণ, বিদেশি পরামর্শক আর পলিটিক্যাল কনসালট্যান্টদের খরচ বাঁচে।
কিন্তু এই সুপারম্যানদের একটাই সমস্যা আছে, তাহারা গান-বাজনা পছন্দ করেন না। সংস্কৃতির প্রতি তাহাদের ভীষণ অনীহা, এমন যে লোকাল কনসার্ট হইলে তাহারা আসিয়া বলিয়া যায়, “এত শব্দ কেন?” রবীন্দ্রসংগীত শুনলে তাহারা মাথা নাড়িয়া বলে, “আসতাগফেরুল্লাহ” লোকেরা প্রথমে ভাবিল, ওনারা হয়ত ক্লাসিক্যাল মিউজিক পছন্দ করে কিন্তু পরে জানা গেল, ওনারা মোটেই মিউজিক পছন্দ করে না; গানের সুরে তাহাদের রুহানী শক্তি ক্ষুণ্ণ হয়। তাই তাহারা সংস্কৃতিক চর্চায় মন বসায় না; নাটক, কবিতা, নাচ সবই তাহাদের কাছে অপ্রয়োজনীয়।
আরও মজার ব্যাপার, এই সুপারম্যানরা অন্য আকীদার মানুষদের পাপিষ্ঠ দাবী করে। তাহারা বলে, “তোমরা বেশি হাসিওনা না, বেশি খাইয়ো না, বেশি আনন্দ করিও না”। এমনকি কেউ যদি শুক্কুরবারে একটু আনন্দ করে, তাহারা তৎক্ষণাৎ সতর্ক করিয়া দেয়। ফলে সমাজে এক নতুন রীতির জন্ম, ‘সুপার-শৃঙ্খলা’, যেখানে আনন্দকে অপরাধ মনে করা হয়। গ্রামের মেলা বন্ধ, বাউল উৎসব বন্ধ, কফিহাউসের লাইভ মিউজিক বন্ধ; মানুষ বলে, “ধন্যবাদ সুপারম্যান, কিন্তু একটু গান শুনিলে খারাপ হইতোনা।”
তথাপিও আমরা বাংলাদেশিরা কৃতজ্ঞ। কেননা তাহারা পৃথিবীতে আসিয়া সরাসরি আমাদের দেশে নামিয়াছে, এটা পরম সৌভাগ্যের কথা! আমরা ভাবি, আমাদের দেশ এতই গুরুত্বপূর্ণ যে সুপারম্যানরা এখানে অবতরণ করিল। আমরা তাহাদের জন্য মিষ্টি বানাই, ফুল দিই আর কখনো কখনো তাহাদের অনুরোধ মেনে নিয়ে নিজেদের জীবনযাত্রা বদলাই।
তবে এক প্রশ্ন থাকিয়া যায়, যদি সুপারম্যানরা গান পছন্দ না করে, সংস্কৃতি বঞ্চিত হয় আর মানুষকে ‘পাপিষ্ঠ’ বলে চিহ্নিত করে, তখন কি আমরা সত্যিই ধন্য? হয়ত ধন্যতা আর সন্দেহের মধ্যে এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি জন্মায়। আমরা হাসি, কাঁদি আর ভাবি, এই সুপার শক্তির যুগে কি আমাদের মানবিকতা রক্ষা পাইবে? নাকি আমরা এমন এক সমাজ গড়িব, যেইখানে সুপারম্যানগণ সব ঠিক করিয়া দিবে আর আমরা শুধু তাহাদের আদেশ মানিব?
শেষে বলিতে ইচ্ছে করে, সুপারম্যানরা আসুক, সূর্যকে দাঁড় করাক, বেহেশত খুলিয়া দিক, আল্লাহর কৃপায় আমাদের জীবন আলোকিত হোক কিন্তু গান বাজনা, কবিতা আর মানুষের হাসি যেন অক্ষুণ্ণ থাকে। কারণ গান ছাড়া জীবন অচল; সংস্কৃতি ছাড়া জাতি শূন্য। সুপারম্যানরা যদি আমাদের সুখ চায়, তাহারা প্রথমে গান শিখুক, তারপরই বেহেশতের টিকেট বিলি করুক।
লেখক: এক ক্লান্ত পেন্সিল, রুহানী জৌলুষে যে মানবিকতা হারাইতে বসিয়াছে