সর্বশেষ

ইনকুইজিশনের প্রেতাত্মা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:৪৩
ইনকুইজিশনের প্রেতাত্মা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

‘যখন ধর্ম এবং রাজনীতি মিলিত হয়, তখন ইনকুইজিশনের জন্ম হয়’- আলজেরীয় বংশোদ্ভূত ফরাসি দার্শনিক ও নোবেলজয়ী সাহিত্যিক আলবার্ট কামুর এই উক্তি কেবল একটি দার্শনিক সতর্কবার্তা নয়; এটি ইতিহাসের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা এক নির্মম সত্য। ধর্ম যদি ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সীমা অতিক্রম করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভাষায় কথা বলতে শুরু করে, তখন তা মানবমুক্তির পথ দেখায় না বরং নিপীড়নের বৈধ কাঠামো তৈরি করে। ইতিহাস ও বর্তমান উভয়ই এই সত্যের সাক্ষী।

 

ধর্ম মূলত মানুষের আত্মিক উৎকর্ষ, নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও সংযমের চর্চা। এটি ব্যক্তির বিবেক ও বিশ্বাসের জগৎ। অন্যদিকে রাজনীতি হলো ক্ষমতার খেলা। সেখানে ক্ষমতা অর্জন, টিকিয়ে রাখা এবং প্রয়োগের কৌশল। রাজনীতি আপস চায়, সংখ্যাগরিষ্ঠতা চায়, কখনো বলপ্রয়োগও চায়।

 

এই দুই সত্তা যখন একে অপরের সঙ্গে গুলিয়ে যায়, তখন ধর্ম তার নৈতিক শক্তি হারিয়ে রাষ্ট্রীয় দমননীতির ছাপ্পর হয়ে ওঠে। আর রাজনীতি যুক্তি ও গণতান্ত্রিক বিতর্ক ছেড়ে ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে জনতাকে নিয়ন্ত্রণের কৌশলে পরিণত হয়। এর ফলাফল-ভিন্নমতের মৃত্যু, প্রশ্ন করার অপরাধ এবং  নাগরিক অধিকারের ক্রমাবনতি।

 

ইউরোপের মধ্যযুগীয় ইতিহাসে ইনকুইজিশন নিপীড়নের এক ভয়াল নাম। চার্চ ও রাষ্ট্রের যৌথ ক্ষমতায় ‘ধর্মদ্রোহী’ তকমা দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে বিচারহীনভাবে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়েছিল। ১৪৭৮ থেকে ১৮৩৪ সাল পর্যন্ত স্পেন ও পর্তুগালের ইনকুইজিশনে লাখো মানুষ নিগৃহীত হয়েছে। অনেক মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে।  

 

এই প্রবণতা কেবল খ্রিস্টীয় ইউরোপেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামি বিপ্লব প্রথমে মুক্তির স্বপ্ন দেখালেও অচিরেই তা নারীর স্বাধীনতা, ভিন্নমত, সংখ্যালঘু ও বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় দমননীতিতে পরিণত হয়। ভারতে আজ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ গণতন্ত্রের ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে এবং সংখ্যালঘু পরিচয় ক্রমেই নিরাপত্তাহীন হয়ে উঠছে। ইতিহাস আমাদের বারবার বলে দিয়েছে-ধর্ম যখন রাষ্ট্রের ক্ষমতা পায়, তখন তা উপাসনার পথ নয়; দমনের অনুমোদিত কাঠামো হয়ে ওঠে।

 

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অঙ্গীকার নিয়ে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল—এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া রাজনৈতিক শিক্ষা। কিন্তু এই আদর্শ বেশিদিন টেকেনি। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর  রহমান সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ সংযোজন করেন এবং ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি বাদ দেন। এরপর প্রেসিডেন্ট এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন। ধর্ম ক্রমে  রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধতার অস্ত্রে পরিণত হয়।  

 

এই ধারাবাহিকতার সবচেয়ে জটিল ও বিপজ্জনক রূপ আমরা দেখি শেখ হাসিনার শাসনামলে। রাজনৈতিক ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করার প্রয়োজনে আওয়ামী সরকার হেফাজতে ইসলামের মতো একটি কট্টরপন্থী ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে বাস্তবিক অর্থে সমঝোতার পথে হাঁটে। ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনার পর যে সংঘাতপূর্ণ সম্পর্ক ছিল, তা ধীরে ধীরে রূপ নেয় বোঝাপড়ায়। কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়। যা শিক্ষা সংস্কারের নয় বরং রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করার কৌশল হিসেবেই ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।

 

এই সমঝোতার ফল আজ স্পষ্ট। পাঠ্যবই সংশোধন, ভাস্কর্য অপসারণ, নারীর ভূমিকা সংকোচনের দাবিতে হেফাজতে ইসলামের মতো সংগঠন বারবার রাষ্ট্রকে নতি স্বীকারে বাধ্য করেছে। ব্লগার, লেখক ও প্রকাশক হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে এক আধুনিক ইনকুইজিশনের প্রতিচ্ছবি হাজির করেছে। যেখানে কলম ধরা মানেই মৃত্যুঝুঁকি, প্রশ্ন তোলা মানেই ধর্মদ্রোহ।

 

আরও উদ্বেগজনক হলো-বর্তমান রাজনীতিতে জামায়াতসহ কিছু ইসলামী  দলের পক্ষ থেকে নারীর ভূমিকা নিয়ে যে বক্তব্য আসছে, তা কেবল পশ্চাৎপদ নয়, সরাসরি সমাজব্যবস্থার জন্য হুমকি। নারীকে নিরাপত্তার নামে ঘরে বন্দি রাখার মানসিকতা, ধর্মের মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে নারী স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা—এসব ধর্মের শিক্ষা নয়;এগুলো রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাষা। এখানে ধর্ম ব্যবহার হচ্ছে এক ধরনের নৈতিক পুলিশিংয়ের হাতিয়ার হিসেবে।  

 

ধর্মীয় লেবাসে রাজনীতি যত শক্তিশালী হবে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ততই অন্ধকারের দিকে যাবে। তখন বাকস্বাধীনতা আর নাগরিক অধিকার থাকবে না মৌলিক অধিকার হিসেবে বরং শর্তসাপেক্ষ অনুমতি হয়ে উঠবে। নারী ও সংখ্যালঘুরা ক্রমে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বাইরে ঠেলে পড়বে, আর সমাজে বৈষম্য ধর্মীয় নৈতিকতার নামে বৈধতা পাবে। সংস্কৃতি, সাহিত্য ও সৃজনশীল চিন্তা তখন  ‘অশালীনতা’ বা ‘ধর্মবিরোধিতার’ অভিযোগে অপরাধে পরিণত হবে। রাষ্ট্র ধীরে  ধীরে ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠান না হয়ে এক ধরনের নৈতিক দমনযন্ত্রে রূপ নেবে। এটি কোনো আশঙ্কা নয়;ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, ধর্ম ও ক্ষমতা একত্র  হলে স্বাধীনতাই প্রথম শিকার হয়।

 

আলবার্ট কামুর সতর্কবাণী কেবল অতীতের জন্য নয়, আজকের বাংলাদেশের জন্যও সমান প্রাসঙ্গিক। রাজনীতিবিদদের স্পষ্ট করে বলতে হবে-ধর্মের স্থান   ব্যক্তির বিশ্বাসে ও উপাসনালয়ে, রাষ্ট্রের স্থান সংবিধান, মানবাধিকার ও নাগরিক সমতায়। নইলে ধর্মরাজনীতির নামে নতুন এক ইনকুইজিশন আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রকে গ্রাস করবে। একবার এই দুই সত্তা মিশে গেলে, জন্ম নেয় নিপীড়নের সেই প্রেতাত্মা। যাকে কামু এক কথায় বলেছিলেন,‘ইনকুইজিশন’।

সব খবর