খোদা তালা নাফরমানদের উপর গজব নাজিল করিয়া থাকেন ইহা পুস্তকে পুস্তকে লিখিত, মোল্লার মিনারে ঘোষিত, ভক্তজনের জিহ্বায় জপিত। এতকাল বাংলায় ফ্যাসিস্ট শাসন বিরাজমান ছিল বলিয়া ভূগর্ভস্থ প্লেটনিক প্লেট যেন মহাশুন্যে ধ্যানরত যোগীর ন্যায় স্থির—নড়িত না, চড়িত না, কাঁপিত না। অবশেষে ফ্যাসিস্ট শাসনের বিদায়-বেল বাজিতে প্লেট ভাঙিল, চিরিয়া চুরমার হইল; আর দেখো, দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ ভূমিকম্পে ধন্য হইল!
তৌহীদি জনতা উল্লাসে নৃত্য করিল যেন শবে-বরাতের হালুয়া রুটি প্রাপ্তি। তাহারা বলিল, “আমদানিনির্ভরতাই সকল দুঃখের মূল।” পেঁয়াজ-আলু না আসিলে গরুর গোশত জমে না, এ কথায় কিছুটা ছাড় দিতে পারে ইসলাম-অন্তপ্রাণ বীর বাঙালী; কিন্তু এ যে ভূমিকম্প, ইহা কি আনয়নের বস্তু? ভূমিকম্পও যদি প্রতিবেশীর করুণায় আনিতে হয়, তবে স্বাধীনতার মান কোথায় গেল? আল্লাহ কি বিধর্মীদের অধিক মহব্বত করেন বলিয়া তাহাদের দেশেই সর্ববিধ বালা-মুসিবত বরদান করেন? না, এবার জনতার সরকার আসিয়াছে; বিধর্মীদের বালা-মুসিবত হইতে মুক্তি দিয়ে খোদা আমাদের ঘরেই আকর্ষণীয় মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপাদন ক্ষমতা দান করিয়াছেন—কি অমোঘ রহমত!
প্রথম পর্যায়ে পরীক্ষামূলক ৫.৫ মাত্রার একখানা ভূমিকম্প মাঠে নামাইয়া সহনশীলতার প্র্যাকটিক্যাল গ্রহণ করা হইল। শিক্ষামন্ত্রক বলিল, “সৃজনশীল প্রশ্নে এত বিতর্ক! এখন হইতে নূতন কারিকুলাম—প্রতি সেমিস্টারে একখানা ভূমিকম্প, দুইখানা ঝড়, তিনখানা ঝঞ্ঝা; জাতি বিজ্ঞানসম্মতভাবে সহনশীলতায় আন্তর্জাতিক মানে উত্তীর্ণ হইবে।” এ কথা শুনিয়া আলেম-ওলামাগণ সাধুবাদে আসমান কাঁপাইলেন। বলিলেন, “ইহুদী-নাসারাদের জুলুম হইতে মুক্তি মিলিয়াছে; ফ্যাশিবাদ বিদায় নিল বলিয়া আমরা এখন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বালা-মুসিবত উৎপাদন ও রপ্তানির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হইব। আমরা অচীরেই এমন ভূমিকম্প উৎপাদন করিবো যাহা দেখিয়া প্রতিবেশী রাষ্ট্র থরোথরো করিয়া কম্পন করিবে।” বেলা-বোর্ডের চেয়ারম্যান ঘোষণা করিলেন—“রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা: প্রতিবছর তিনটি ভূমিকম্প, পাঁচটি ঝড়, এক রাশি বজ্রপাত; ডলার-অর্জন বাড়াই।”
ইহারই পর কেহ কেহ প্রস্তাব করিল—“ভূমিকম্পের ব্র্যান্ডিং করিতে হইবে।” যেমন “বাংলাদেশি জামদানি”—তেমনি “বাংলাদেশি ভূমিকম্প,” সূক্ষ্ম কম্পন, গভীর মানবিকতা, হালকা দুলুনি, অল্প ফাটল—সব আছে, কিন্তু অতি রক্তপাত নাই; সংস্কৃতিমনা ভূমিকম্প। বিজ্ঞাপন-কপি প্রস্তুত: “আমাদের কম্পন—আপনার জাগরণ।”
এদিকে মৌলবাদের উত্থান দেখিয়া সংস্কৃতি-শিক্ষা-সৃজনশীলতা পরিহাসের পাত্র হইয়া উঠিল। কেহ কহিল, “কবিতার প্রয়োজন কি, যখন গজবের মহিমা আছে?” কেহ যোগ করিল, “গান-নাচে জাতি উন্নত হয় না; কম্পনে হয়। মাইক্রোফোনের বদলে রিখটার।” তাই শিক্ষাঙ্গনে নতুন অনুশীলন—প্রার্থনার পর ‘কম্পন-ড্রিল’; লাইব্রেরিতে ‘দুলুনি-সেশন’; নাট্যমঞ্চে ‘ঝঞ্ঝা-রিহার্সাল’। সৃজনশীলতার বদলে সহনশীলতার স্কোর তোলা হইতেছে—কার কত কাঁপুনি-সহিষ্ণুতা!
অদ্ভুত উপমায় বুঝাই—গৃহস্থ যেমন গোশত জমাইবার নিমিত্তে পেঁয়াজ-আলুর আশায় থাকে, রাষ্ট্র তেমনই ভূমিকম্পের জন্য প্রতিবেশীর দিকে চাহিয়া থাকিত। এখন আর সে দুঃসময়ের প্রয়োজন নাই; স্বয়ংসম্পূর্ণতায় জাতি আত্মনির্ভর। বাজারে ‘দায়িত্বশীল কম্পন নীতিমালা’ জারি—রাত্রি ৩টা থেকে ৫টা প্রধান কম্পন-স্লট, যেন অফিস-যাত্রায় বিঘ্ন না ঘটে; শুক্রবারে হালকা আফটারশক, যাতে খুতবার মধ্যে আমেজ থাকে।
সংস্কৃতি কর্মীরা মৃদু হাসিয়া বলিল—“আমাদের নাট্যোৎসব বাতিল, কিন্তু কম্পন উৎসব চলিতেছে।” শিল্পীরা তুলির আঁচড়ে তির্যক রেখা টানিয়া বলিতেছেন—“দেখো, দুলুনি-দর্শনই এখন নতুন অ্যাভাঁ-গার্দ।” পাঠকবর্গ ভাবিতেছেন—“সাহিত্য কি তবে ভূমিকম্পের ফটনোট?” বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা—“কম্পন-তত্ত্ব ও জাতীয় পরিচয়”—উদ্দেশ্য: কিভাবে ‘বালা-মুসিবত’ হইতে ‘ব্র্যান্ডেড রপ্তানি’তে উত্তরণ সম্ভব।
তবু প্রশ্ন থাকিয়া যায়—খোদার রহমত কি শুধুই কম্পনের মধ্যেই বাধা? মানবিকতা, বিজ্ঞানচর্চা, মুক্তচিন্তা—ইহারা কি সব বাতিল? আমরা কি গজবের মহিমা গাহিতে গাহিতে মানুষ হইবার সাধ ভুলিয়া গেলাম? ফ্যাশিবাদ বিদায়—কল্যাণ; কিন্তু উগ্রতার আগমন—কল্যাণ নহে। প্লেট ভাঙিলে ঘরও ভাঙে, মানুষও আঘাত পায়—এই সহজ সত্য শিক্ষার ক্লাসে ফিরাইতে হয়।
সুতরাং, ব্যঙ্গের শেষবাণী—স্বয়ংসম্পূর্ণ ভূমিকম্পে আত্মহর্ষিত হইব না, বরং স্বয়ংসম্পূর্ণ মানবিকতায় আত্মনির্ভর হই। বালা-মুসিবত রপ্তানি করিবার আগে করুণা, যুক্তি, সংস্কৃতি ও শিক্ষার পুনঃস্থাপন করি। কম্পনে নয়, করুণায় জাতি উত্তীর্ণ হোক; তাহাই খোদার প্রকৃত রহমত।
লেখক: এক ক্লান্ত পেনসিল - উন্মত্ততার তরবারির নিচে গর্দান দিয়া রাখি