সর্বশেষ

বছর শেষে বাংলাদেশ

সহিংস-সংস্কৃতি ও নীরবতার রাজনীতি

প্রকাশিত: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০
সহিংস-সংস্কৃতি ও নীরবতার রাজনীতি

২০২৫ সাল বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্য ছিল এক অস্বস্তিকর সময়। এই বছরটি যেমন শিল্প–সৃজনের কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে, তেমনি একই সঙ্গে উন্মোচিত করেছে একটি গভীর সংকট। যেখানে সংস্কৃতি, মতপ্রকাশ ও বহুত্ববাদ ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। বছর শেষে ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয় এটি কেবল শিল্পের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও নৈতিক অবস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার বছর।

 

যদিও চলচ্চিত্র অঙ্গনে ২০২৫ সাল কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছে। ‘দেলুপি’, ‘রইদ’, ও ‘মাস্টার’ এই তিনটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইউরোপের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসবে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে নতুন করে পরিচিত করেছে। একই সঙ্গে ঈদ ও অন্যান্য মৌসুমে মুক্তি পেয়েছে একাধিক ঢালিউড চলচ্চিত্র। সরকারি অনুদান পাওয়া চলচ্চিত্র নিয়েও আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। যা একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক পরিসরে স্বাভাবিক। কিন্তু এই সৃজনশীলতার আলো খুব দ্রুতই ঢাকা পড়ে গেছে সহিংসতার দীর্ঘ ছায়ায়।

 

সবচেয়ে গভীর উদ্বেগের জায়গাটি তৈরি হয়েছে চলতি বছরের ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক সহিংসতায়। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে দেশের একাধিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় এবং সাংবাদিকরা সরাসরি আক্রমণের শিকার হন। চলতি বছরের একুশের বই মেলায় ‘মব’ সৃষ্টি করে প্রকাশনা স্টল বন্ধ করে দিতে বাধ্য করা হয়। এমন কি ইসলামি জলসা আয়োজনও তৌহিদী-জনতার আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়নি। এসব ঘটনা নিছক আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়, এগুলো সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।    

 

এই সহিংসতার ধারাবাহিকতা কেবল শহুরে প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বছরের বিভিন্ন সময়ে দেশের নানা প্রান্তে বাউলদের ওপর আক্রমণ, মাজার ভাঙচুর এবং লোকজ সংস্কৃতির অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ‘বাউলগান’ যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ভূখণ্ডের মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাহক, সেটিই আজ আঘাতের লক্ষ্যবস্তু।

 

কনসার্ট ও সাংস্কৃতিক আয়োজন ঘিরেও একই চিত্র দেখা গেছে। বিভিন্ন জায়গায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। কখনো প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে, কখনো তথাকথিত ধর্মীয় অনুভূতির অজুহাতে। সর্বশেষ ফরিদপুরে জনপ্রিয় শিল্পী জেমসের কনসার্টে ‘তৌহিদি জনতা’ নামে হামলার ঘটনা এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। এই ঘটনা শুধু একটি কনসার্টে হামলা নয়; এটি সংস্কৃতিকে প্রকাশ্যভাবে আতঙ্কে রাখার এক নগ্ন দৃষ্টান্ত।  

 

উদ্বেগের বিষয় হলো-এই সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রবণতার অংশ, যেখানে সংস্কৃতিকে ‘অনুমোদিত’ ও ‘অননুমোদিত’ এই দুই ভাগে ভাগ করার চেষ্টা চলছে। কোথাও গান চলে, কোথাও চলে না; কোথাও শিল্পী স্বাগত, কোথাও তিনি ‘অপরাধী’। এই বাছাইকৃত গ্রহণযোগ্যতাই সংস্কৃতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।  

 

আন্তর্জাতিক মহলেও এসব ঘটনা নজরে এসেছে। মতপ্রকাশ ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা এসব হামলাকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছে। কারণ ইতিহাস বলে-যে সমাজে সংস্কৃতি চর্চা থেমে যায়, সেখানে একসময় প্রশ্ন করাও থেমে যায়।

 

এই পরিস্থিতিকে বুঝতে হলে আমাদের আরও এক ধাপ পেছনে তাকাতে হবে। এর আগের সময়েও দেশে সাংস্কৃতিক পরিসরে কিছু হামলার ঘটনা ঘটেছে। বাউলদের উপর হামলা, লালন ভাস্কর্য ভাংচুর-এর ঘটনা একেবারে অতীত হয়ে যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে তখন প্রতিক্রিয়া ছিল দুর্বল বা নীরব। সহিংসতাকে কখনো ‘ধর্মীয় অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ’, কখনো ‘বাস্তবতা’ বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই নৈতিক আপসই আজকের পরিস্থিতির পথ তৈরি করেছে।

 

সহিংসতা যদি ভুল হয় তবে তা সব সময়েই ভুল। একে সময় ও সুবিধা অনুযায়ী বৈধতা দিলে সমাজে সহিংসতার একটি বিপজ্জনক স্বাভাবিকীকরণ ঘটে। ২০২৫ সাল আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে সেই সত্যটাই দেখিয়ে দিয়েছে।

 

এই বছরটি প্রমাণ করেছে সংস্কৃতি কেবল গান, চলচ্চিত্র, আবৃত্তি, মেলা বা উৎসবের বিষয় নয়। এটি হলো বহুত্ববাদ, সহিষ্ণুতা এবং ভিন্নমতের সহাবস্থানের চর্চা। যখন বাউল শিল্পী আক্রান্ত হন, মাজার ভাঙা হয়, কনসার্ট বন্ধ করা হয় বা শিল্পীকে ভয় দেখানো হয় তখন আসলে একটি সমাজের আত্মাই আঘাতপ্রাপ্ত হয়।

 

২০২৫ সালে আমরা নিন্দা জানিয়েছি, বিবৃতি দিয়েছি, উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়-আমরা কি ধারাবাহিকভাবে দাঁড়াতে পেরেছি? নাকি নীরবতা ও সুবিধাজনক ব্যাখ্যাই আমাদের প্রধান প্রতিক্রিয়া হয়ে উঠেছে? যেখানে স্পষ্ট হয়ে গেছে-সংস্কৃতি বাঁচে শুধু সৃষ্টিতে নয়; বাঁচে সাহসী অবস্থান, ন্যায়বোধ এবং সব ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে সমান ও স্পষ্ট প্রতিবাদে।

 

এই পাঠটি আমরা যদি গ্রহণ না করি তবে সামনে যত বড় বড় সাংস্কৃতিক উৎসবই হোক না কেন তার জাঁকজমকের আড়ালে সংস্কৃতির অন্তর্গত প্রাণশক্তি ক্রমশ ক্ষয়ে যেতে থাকবে। বাহ্যিক আয়োজন বাড়বে, মঞ্চ উজ্জ্বল হবে কিন্তু সৃজন, প্রতিবাদ ও মানবিক সংবেদনশীলতার যে গভীর স্রোত সংস্কৃতিকে জীবিত রাখে; তা একসময় নিঃশব্দে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই থেকে যাবে। আর সেটাই হবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি।

সব খবর