দেশের বিভিন্ন জেলায় বাউল শিল্পী ও তাদের অনুসারীদের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে। মানিকগঞ্জে বাউলশিল্পী আবুল সরকার মহারাজের পরিবেশনাকে ঘিরে ৪ নভেম্বর যে উত্তেজনার সূত্রপাত, তার রেশ ধরে গত কয়েকদিনে ঠাকুরগাঁও, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে আবুল সরকার মহারাজকে গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানো হলেও, অনেকেই মনে করছেন এসব হামলার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, ধর্মীয় উগ্র গোষ্ঠীর সংগঠিত ভূমিকা, এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের বিস্তার।
ঘটনার শুরু মানিকগঞ্জে
৪ নভেম্বর ঘিওরে “জীব ও পরম” পালাগানের এক পরিবেশনায় মুখোমুখি ছিলেন দুই পালাকার—মানিকগঞ্জের আবুল সরকার মহারাজ ‘জীব’-এর পক্ষে যুক্তি দিচ্ছিলেন এবং ফরিদপুরের আরেক আবুল সরকার ‘পরম’-এর পক্ষে। প্রায় চার ঘণ্টার এই দার্শনিক পালা থেকে কয়েক সেকেন্ডের একটি অংশ কেটে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হয় ‘ধর্ম অবমাননার প্রমাণ’ হিসেবে। এরপরই ধর্মীয় গোষ্ঠীর উত্তেজনা তৈরি হয় এবং ২৩ নভেম্বর তার ভক্তদের ওপর প্রথম হামলা চালানো হয়।
একই অভিযোগে মামলা দায়েরের পর দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয় বাউল এই শিল্পীকে। তবে ভক্ত–অনুরাগী, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং শিক্ষকরা এই গ্রেপ্তার ও হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে নিঃশর্ত মুক্তির দাবি তুলেছেন।
ধারাবাহিক হামলা, সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
জুলাই দাঙ্গা পরবর্তী সময়ে মাজার, সংখ্যালঘু, মুক্তচিন্তার মানুষ ও ভিন্ন মতাদর্শীদের ওপর হামলার ধারাবাহিকতার কথাও উল্লেখ করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের অভিযোগ—সরকার ও প্রশাসন নিষ্ক্রিয়, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ঘটনাটিকে ‘অস্বস্তিকর’ বলে স্বীকার করেন। তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম মনে করেন, “অতীতের ‘মজলুমরা’ এখন জুলুম করছে।” প্রেস সচিব শফিকুল আলম এটিকে ‘ট্র্যাজিক’ বলে জানিয়েছেন।
এদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “এটি উগ্র ধর্মান্ধদের হামলা; কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
অবশেষে বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাউলদের ওপর হামলায় জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন দাবী করেছেন প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
পালাগান সংস্কৃতি: ভুল ব্যাখ্যা ও উত্তেজনার রাজনীতি
নাট্যকার ও গবেষক শাকির দেওয়ানের মতে, বিষয়টি পুরোপুরি পালাগানের ভুল ব্যাখ্যা। “জীব ও পরম” পালার বয়স শত বছরেরও বেশি। এটি দেওয়ান পরিবারের সৃষ্টি ও মরমী গানের ঐতিহ্যের অংশ।
পালাগানে যুক্তিতর্ক থাকলেও ব্যক্তিগত বিদ্বেষ কখনোই থাকে না। পরিবেশনের শেষে দুই শিল্পী একে অপরকে আলিঙ্গন করেন যা ‘জুড়িপালা’ নামে পরিচিত। তিনি বলেন, “পুরো চার ঘণ্টা না শুনে একটি অংশ কেটে প্রচার করা ন্যক্কারজনক।”
‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হামলা’—ফরহাদ মজহার
কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার মনে করেন, “কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওকে কেন্দ্র করে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে।” তার ভাষায়, “যারা ইসলামের নামে বাউলদের ওপর হামলা করছে, তারা আসলে ইসলামবিরোধী এবং সমাজে আতঙ্ক ছড়ানোর লক্ষ্যেই কাজ করছে।”
কোনো আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ শক্তিও এ ঘটনায় ভূমিকা রাখতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। “এটি সেক্যুলার জাতিবাদ ও ধর্মীয় জাতিবাদের দ্বন্দ্ব, যা সামনে বড় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক রূপ নিতে পারে।”
‘জালিম একই, শুধু লেবাস বদলেছে’—সৈয়দ জামিল আহমেদ
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক ও নাট্যব্যক্তিত্ব সৈয়দ জামিল আহমেদ বলেন, “বাউল গান মানুষকে প্রেম ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। যারা হামলা করছে, তারা অতীতেও জালিমদের মতোই আচরণ করতো।”
তিনি প্রশাসনের উদাসীনতার সমালোচনা করে বলেন, “পুলিশ ভয়ে-ভয়ে থাকায় এসব হামলাকারী আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।”
বাউলদের ওপর সাম্প্রতিক হামলা শুধু সাংস্কৃতিক নিপীড়ন নয়, এটি ধর্মীয় উগ্রবাদ, রাজনৈতিক চাল এবং সামাজিক অস্থিরতার একটি বিপজ্জনক সমাবেশ। বহু বিশ্লেষক মনে করছেন, এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এর পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।