ঢাকার বনানীর কড়াইল বস্তি রাজধানীর মাঝখানে গড়ে ওঠা সবচেয়ে বড় অনানুষ্ঠানিক বসতি। নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে গবেষণার জন্য যেমন এটি পরিচিত, তেমনি বারবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের জন্যও আলোচনায় আসে। গত ১০ বছরে অন্তত সাতবার বড় আগুনে হাজারো ঘর পুড়ে গেছে। প্রতিবারই অবৈধ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, সংকীর্ণ গলি, কাঠ-টিনের ঘর এবং ফায়ার সার্ভিসের দেরিতে পৌঁছানো নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু কার্যকর সমাধান হয় না।
সর্বশেষ ২৫ নভেম্বর বিকাল ৫টা ২২ মিনিটে আগুনে প্রায় ১৫শ’ ঘর পুড়ে যায়। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিট কাজ করে। কর্মকর্তারা জানান, সরু রাস্তার কারণে গাড়ি ভেতরে ঢুকতে পারেনি, দূর থেকে পাইপ টেনে কাজ করতে হয়েছে। আগুনের উৎস তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, তবে যত্রতত্র বিদ্যুতের তার ও গ্যাস সিলিন্ডার ছিল।
এর আগে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ৫০০ ঘর, ২০১৭ সালের মার্চে হাজারখানেক ঘর, ২০১৮ সালের মার্চে ৫০০ ঘর পুড়ে যায়। ২০২৪ সালে মার্চ ও ডিসেম্বরে দুটি বড় আগুনে ব্যাপক ক্ষতি হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও আগুন লাগে, তবে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। প্রতিবারই একই ঝুঁকি সামনে আসে, কিন্তু সমাধান হয় না।
কড়াইল বস্তি শুধু শ্রমজীবী মানুষের আবাস নয়, এখানে ছোট ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাও আছে। জমি রাষ্ট্রীয় সংস্থার মালিকানাধীন হলেও স্থানীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ চলে কমিউনিটি নেতাদের হাতে। ভাড়ার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষ হয়, ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। অনেক বাসিন্দা সন্দেহ করেন, আগুন শুধু দুর্ঘটনা নয়, কখনও কখনও শত্রুতার ফলও হতে পারে।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, ফায়ার সার্ভিস প্রায়ই দেরিতে পৌঁছায়। গাড়ির পানি শেষ হয়ে গেলে খাল থেকে পাইপ টেনে পানি আনা হয়। প্রতিবারই একই চিত্র দেখা যায়। এক নারী বলেন, ‘‘দুইবার সব হারালাম, সরকার তদন্ত করে না। কষ্টের টাকায় বাঁচার অধিকারও আমাদের নেই।’’ অন্যরা বলেন, উচ্ছেদ হলে পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি আছে, তাই এখানেই থাকেন। কাজের সুযোগ, সামাজিক সহায়তা ও অভ্যস্ততার কারণে তারা ঝুঁকি জেনেও এলাকা ছাড়েন না।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, আগুনের ঘটনায় কখনও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, কখনও শর্ট সার্কিট দায়ী হয়েছে। অবৈধ সংযোগ বন্ধে বিদ্যুৎ বিভাগ ও তিতাসের সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন। প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
এদিকে আগুনের পর আবারও আলোচনায় আসে কড়াইল হাইটেক পার্ক প্রকল্প। বেসিস সভাপতি বলেছিলেন, এখানে হাইটেক পার্ক করার পরিকল্পনা আছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কড়াইলে অবকাঠামো তৈরির কোনও প্রকল্প নেই।
ব্র্যাকের নগর উন্নয়ন কর্মসূচির পরিচালক বলেন, মানুষ এখানে থাকে কারণ তাদের কর্মক্ষেত্র কাছেই। পুনর্বাসন দূরে হলে তারা যাবে না। অবৈধ গ্যাস, বিদ্যুৎ ও কেবল সংযোগের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবুও মানুষ এখানেই থাকে, কারণ জীবিকার সঙ্গে তাদের জীবনযাত্রা জড়িয়ে আছে।
সব মিলিয়ে কড়াইল বস্তি বারবার আগুনে পুড়লেও কার্যকর সমাধান হয়নি। হাজারো মানুষ মৃত্যুভয় জেনেও এখানে বসবাস করছে, কারণ তাদের জীবনের বিকল্প কোথাও নেই।