নতুন বছরের শুরুতেই রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে জেঁকে বসেছে শীত। হিমেল বাতাস ও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশার কারণে শীতের তীব্রতা বেড়েছে। শনিবার (৩ জানুয়ারি) সকালে ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে আসে ১২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সকাল ৬টায় ঢাকায় তাপমাত্রা ছিল ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৯ শতাংশ, যা শীতের অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তোলে।
উত্তরাঞ্চলের চিত্র আরও ভয়াবহ। নওগাঁয় শনিবার সকাল ৯টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বদলগাছী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্যমতে, বুধবার মধ্যরাত থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সূর্যের দেখা মেলেনি। ঘন কুয়াশা ও ঠান্ডা বাতাসে জেলার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও খেটে খাওয়া মানুষ। তীব্র শীতে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না, তবে জীবিকার তাগিদে রিকশা, ভ্যান ও অটোরিকশা চালকদের কুয়াশার মধ্যেই বের হতে হচ্ছে। এতে আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ছয় ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, দুপুর পর্যন্ত ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় আবহাওয়া প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। আকাশ অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা থাকবে, আবহাওয়া শুষ্ক থাকবে এবং মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৬ থেকে ১২ কিলোমিটার বেগে হালকা বাতাস প্রবাহিত হতে পারে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ কমিটি জানিয়েছে, জানুয়ারি মাসজুড়ে দেশে চার থেকে পাঁচটি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে দুই থেকে তিনটি হবে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার এবং এক থেকে দুটি মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। তীব্র শৈত্যপ্রবাহের সময় দেশের কোনো কোনো এলাকায় তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসতে পারে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও নদী অববাহিকার জেলাগুলোতে শীতের প্রকোপ বেশি অনুভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়াবিদ মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, জানুয়ারিতে দিন ও রাতের গড় তাপমাত্রা মোটামুটি স্বাভাবিক থাকার কথা থাকলেও শৈত্যপ্রবাহের দিনগুলোতে জনজীবনে স্থবিরতা নেমে আসতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারা দেশে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে, যা অনেক সময় দুপুর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। কুয়াশার কারণে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গিয়ে শীত আরও বেশি অনুভূত হয়।
বর্তমানে দেশের কয়েকটি জেলায় শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেছে। যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। গোপালগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, পঞ্চগড়, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গায়ও শৈত্যপ্রবাহ অনুভূত হয়েছে। আবহাওয়াবিদ শাহানাজ সুলতানা জানান, শনিবার তাপমাত্রা কিছুটা বাড়লেও রোববার থেকে আবার কমতে পারে।
আবহাওয়া অফিসের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো এলাকায় তাপমাত্রা ৮ দশমিক ১ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬ দশমিক ১ থেকে ৮ ডিগ্রি হলে মাঝারি এবং ৪ দশমিক ১ থেকে ৬ ডিগ্রি হলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ধরা হয়। ৪ ডিগ্রির নিচে নেমে গেলে সেটিকে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।
ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশে শীতকালে তাপমাত্রা একাধিকবার ৩ ডিগ্রির নিচে নেমেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের রেকর্ড অনুযায়ী, ১৯৬৪ সালে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯৬৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে একই স্থানে তাপমাত্রা নেমে আসে ২ দশমিক ৮ ডিগ্রিতে। স্বাধীনতার পর সবচেয়ে কম তাপমাত্রার রেকর্ড হয় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে, যখন পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় পারদ নেমে আসে ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে—যা এখন পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
উত্তরাঞ্চলে শীত বেশি অনুভূত হওয়ার কারণ হিসেবে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, শৈত্যপ্রবাহের প্রধান প্রবেশপথ এই অঞ্চল। উত্তর ভারতের দিল্লি, কাশ্মীর, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে ঠান্ডা বাতাস রাজশাহী–যশোর বেল্ট ধরে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলে ঘন কুয়াশা বেশি হওয়ায় সূর্যের আলো ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারে না, ফলে দিনের বেলাতেও তাপমাত্রা কম থাকে। রাতে খোলা মাঠের কারণে দ্রুত তাপ বিকিরণ হওয়ায় শীত আরও তীব্র হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শীতের তীব্র অনুভূতির পেছনে কুয়াশাই প্রধান কারণ। কুয়াশা দীর্ঘস্থায়ী হলে মাটি গরম হতে পারে না। আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বাতাসের গতি ঘণ্টায় ৮ থেকে ১৫ কিলোমিটার হলে কুয়াশা কেটে যায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দূষণ ও স্মগের কারণে কুয়াশা আরও ঘনীভূত হচ্ছে, যা শীতের অনুভূতি বাড়াচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়েও আলোচনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতের সময়কাল ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে, তবে নির্দিষ্ট বিরতিতে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ দেখা দেওয়ায় একে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের একমাত্র ফল বলা যাচ্ছে না। তবু ঘন কুয়াশা, দূষণ ও আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণ জনজীবনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।