মিরপুরের রোমাঞ্চকর এক ম্যাচে পাকিস্তানকে ১১ রানে হারিয়ে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ২–১ ব্যবধানে জিতে নিয়েছে বাংলাদেশ। তানজিদ হাসানের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি, তাসকিন আহমেদের আগুনে বোলিং এবং শেষ ওভারের নাটকীয়তায় রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে জয় তুলে নেয় মেহেদী হাসান মিরাজের দল। এই জয়ের ফলে আইসিসি ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়েও এক ধাপ উন্নতি করে ৯ নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।
রোববার মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে টস হেরে প্রথমে ব্যাট করে বাংলাদেশ ৫০ ওভারে ৫ উইকেটে তোলে ২৯০ রান। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে ইনিংসের ভিত গড়ে দেন ওপেনার তানজিদ হাসান। ১০৭ বলে ১০৭ রানের ইনিংসে ছিল একাধিক দৃষ্টিনন্দন বাউন্ডারি ও ছক্কার মার।
বাংলাদেশের শুরুটা ছিল দারুণ। ওপেনিং জুটিতে সাইফ হাসান ও তানজিদ ১৮ ওভারে যোগ করেন ১০৫ রান। তানজিদ ছিলেন শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক, আর সাইফ তুলনামূলক ধীরগতিতে ব্যাট করলেও জুটিকে স্থিতি দেন। ৫৫ বলে ৩৬ রান করে সাইফ বোল্ড হন শাহিন শাহ আফ্রিদির বলে।

দ্বিতীয় উইকেটে নাজমুল হোসেন শান্তকে নিয়ে তানজিদ আরও ৫৩ রান যোগ করেন। শান্ত করেন ৩৪ বলে ২৭ রান। মাঝের ওভারগুলোতে পাকিস্তানের স্পিনাররা কিছুটা চাপ তৈরি করলেও তানজিদ নিজের ছন্দ ধরে রাখেন। ৯৪ রানে পৌঁছে সালমান আলি আগার বলে লং অফ দিয়ে ছক্কা মেরে শতরান পূর্ণ করেন তিনি।
তানজিদের বিদায়ের পর লিটন কুমার দাস ও তাওহিদ হৃদয়ের ৬৮ রানের জুটি বাংলাদেশের ইনিংসকে এগিয়ে নেয়। লিটন করেন ৪১ এবং হৃদয় অপরাজিত থাকেন ৪৮ রানে। শেষ দিকে দ্রুত রান তুলতে না পারায় তিনশর মাইলফলক ছোঁয়া হয়নি বাংলাদেশের।
২৯১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই বিপর্যয়ে পড়ে পাকিস্তান। তাসকিন আহমেদ ও নাহিদ রানার দুর্দান্ত বোলিংয়ে প্রথম তিন ওভারে তিন উইকেট হারায় তারা। তাসকিনের বাউন্সারে ফেরেন সাহিবজাদা ফারহান এবং পরের ওভারে নাহিদের বাউন্সারে বিদায় নেন সাদাকাত। তাসকিনের আরেকটি দারুণ ডেলিভারিতে স্টাম্প ভেঙে যায় মোহাম্মদ রিজওয়ানের।

তবে সেই ধাক্কা সামলে দলকে লড়াইয়ে ফেরান সালমান আলি আগা। মাঝের দিকে তরুণ ব্যাটার সাদ মাসুদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে তোলেন তিনি। ৪৪ বলে ৩৮ রান করে মাসুদ আউট হলেও সালমান একপ্রকার একাই ম্যাচে টিকে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যান।
ফাহিম আশরাফকে সঙ্গে নিয়ে আরেকটি কার্যকর জুটি গড়েন তিনি। এরপর শাহিন শাহ আফ্রিদিকে নিয়ে ম্যাচে নতুন করে আশা জাগান পাকিস্তানের সমর্থকদের। ৮৯ বলে শতরান পূর্ণ করেন সালমান। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এটি তার তৃতীয় সেঞ্চুরি।
শেষ দিকে আফ্রিদির ঝড়ো ব্যাটিংয়ে ম্যাচ আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ৪৯তম ওভারে মুস্তাফিজুর রহমানকে দুটি ছক্কা মারেন তিনি। এমনকি এক ডেলিভারি মুস্তাফিজের হাঁটুতে আঘাত করলে কিছু সময় খেলা বন্ধও থাকে।
শেষ ওভারে পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ১৪ রান। অধিনায়ক মিরাজ ঝুঁকি নিয়ে বল তুলে দেন লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেনের হাতে। আগের ওভারগুলোতে খরুচে হলেও শেষ ওভারে দারুণ স্নায়ু শক্তির পরিচয় দেন রিশাদ।
দ্বিতীয় বলে শাহিন আফ্রিদির ক্যাচ উঠলেও তা ধরতে পারেননি রিশাদ। তবে পরের বলগুলোতে নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে রান আটকে দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত শেষ বলেও আফ্রিদি ব্যাটে বল লাগাতে না পারলে স্টাম্পিং করেন লিটন দাস। তাতেই নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের ১১ রানের জয়।
বাংলাদেশের হয়ে তাসকিন আহমেদ ৪ উইকেট নেন। এছাড়া মুস্তাফিজুর রহমান নেন ৩ উইকেট এবং নাহিদ রানা নেন ২ উইকেট।
এই সিরিজ জয়ের ফলে আইসিসি ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে বড় সুবিধা পেয়েছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানকে হারিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টপকে এখন ৯ নম্বরে উঠে এসেছে তারা। সিরিজের আগে বাংলাদেশের রেটিং পয়েন্ট ছিল ৭৬, যা বেড়ে হয়েছে ৭৯। অন্যদিকে ৭৭ পয়েন্ট নিয়ে দশম স্থানে নেমে গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
আগামী বছরের ৩১ মার্চ র্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে নির্ধারণ হবে বিশ্বকাপে সরাসরি অংশ নেওয়া দলগুলো। স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ে ছাড়া শীর্ষ আট দল সরাসরি খেলবে বিশ্বকাপে। ফলে পাকিস্তানের বিপক্ষে এই সিরিজ জয় বাংলাদেশের বিশ্বকাপ অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক ধাপ বলে মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।