টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের এবারের আসর স্পষ্ট করে দিয়েছে ক্রিকেটে আর ‘দুর্বল’ বলে কিছু নেই। নেপাল, নেদারল্যান্ডস, ইটালি, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা জিম্বাবুয়ের মতো দলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, বড় দলগুলোর জন্য এখন আর কোনও ম্যাচই সহজ নয়। গ্রুপ পর্বের প্রথম সপ্তাহেই একাধিক চমক বিশ্ব ক্রিকেটকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে নাটকীয় ম্যাচে জিম্বাবুয়ের কাছে অস্ট্রেলিয়ার হার ছিল সবচেয়ে বড় অঘটন। দীর্ঘ ১৯ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় তুলে নেয় জিম্বাবুয়ে। ম্যাচ শেষে অধিনায়ক সিকান্দার রাজা বলেন, আইসিসির টুর্নামেন্টগুলো ছোট দেশগুলোর জন্য জীবন বদলে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে, এখানেই তারা স্বীকৃতি ও সম্মান পায়। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান গিভমোর মাকোনিও জানান, এই সাফল্য হঠাৎ আসেনি; দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের ফল এটি।

শুধু জিম্বাবুয়ে নয়, নেপালও শক্তিশালী ইংল্যান্ডকে প্রায় হারিয়েই দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে বড় রানের দিকে যেতে দেয়নি; ৭৭ রানে ছয় উইকেট তুলে নিয়ে চাপে ফেলে দেয়। নেদারল্যান্ডস-পাকিস্তান ম্যাচেও পার্থক্য গড়ে দেয় একটি ক্যাচ মিস। প্রতিটি ম্যাচেই ছিল উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা ও লড়াইয়ের ছাপ।
নামিবিয়ার অধিনায়ক জেরার্ড ইরাসমাস স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘সদস্য দেশ’ বা ‘দুর্বল দল’ ট্যাগ সরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক এডেন মার্করামও স্বীকার করেছেন, সহযোগী সদস্য দেশগুলোর পারফরম্যান্স প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গেছে; তারা এখন বড় মঞ্চে ভয়হীন ক্রিকেট খেলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট নিজেই অঘটনপ্রবণ। ২০ ওভারের খেলায় একজন ব্যাটারের ৩৫ বলে ৭০ রান কিংবা এক ওভারে তিন-চার উইকেট ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে। দীর্ঘ ফরম্যাটে যেখানে সময় থাকে ঘুরে দাঁড়ানোর, টি-টোয়েন্টিতে চারটি খারাপ ওভারই ম্যাচ শেষ করে দিতে পারে। বাংলাদেশের ক্রিকেটার অনুষ্টুপ মজুমদারের মতে, এই ফরম্যাটে শক্তি ও মুহূর্তকে কাজে লাগানোর ক্ষমতাই বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।
ছোট দলগুলোর উত্থানে বড় ভূমিকা রাখছে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ। আইপিএল ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ ক্রিকেট, ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ কিংবা নেপাল প্রিমিয়ার লিগে নিয়মিত খেলছেন সহযোগী দেশগুলোর ক্রিকেটাররা। এতে তারা আন্তর্জাতিক মানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। আইসিসির বাড়তি আর্থিক সহায়তাও অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বহিরাগত ক্রিকেটারদের অন্তর্ভুক্তি। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ওমান বা ইতালির দলে উপমহাদেশীয় বংশোদ্ভূত বহু ক্রিকেটার খেলছেন, যারা নিজ দেশে সুযোগ না পেয়ে অন্য দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে ক্রিকেটেরই বিস্তার ঘটছে।
ফুটবল বিশ্বকাপে যেমন ক্যামেরুন, সেনেগাল বা সৌদি আরব বড় দলকে হারিয়ে চমক দেখিয়েছে, ক্রিকেটেও এখন সেই ধারা স্পষ্ট। যোগ্যতা অর্জন পর্ব পেরিয়ে মূলপর্বে আসা দলগুলো মানসিকভাবে আরও দৃঢ় হয়ে উঠছে। প্রতিটি ম্যাচ তাদের জন্য সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াই।

তবে উন্নতির জায়গাও রয়েছে। সাবেক তারকা সুনীল গাভাস্কার মনে করেন, ক্যাচিং ও মানসিক দৃঢ়তায় আরও উন্নতি করলে ছোট দলগুলো নিয়মিতভাবে বড় দলকে হারাতে পারবে। অযথা বড় শট খেলার প্রবণতা কমিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাটিংয়ে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিল, ক্রিকেটের শক্তির মানচিত্র বদলাচ্ছে। নেপাল, নেদারল্যান্ডস, ইটালি কিংবা যুক্তরাষ্ট্র আর কেবল অংশগ্রহণকারী নয়—তারা প্রতিদ্বন্দ্বী। সামনে অস্ট্রেলিয়ায় পরবর্তী আসরে হয়তো আরও বড় অঘটনের সাক্ষী হবে বিশ্ব ক্রিকেট।