সর্বশেষ

আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির প্রভাবে বাংলাদেশে বেকারত্ব বাড়ছে

প্রকাশিত: ৭ অক্টোবর ২০২৫, ০৪:১৬
আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির প্রভাবে বাংলাদেশে বেকারত্ব বাড়ছে

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশসহ বহু দেশেই কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে এবং বেকারত্ব বেড়েছে বলে গবেষণা ও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ১৯৮১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে আইএমএফের শর্তযুক্ত ঋণ গ্রহণকারী দেশগুলোর শ্রমবাজার নিয়ে গ্রিসের দুই অর্থনীতিবিদ মাইকেল ক্লেটসস ও আন্দ্রেয়াস সিন্টোসের গবেষণায় দেখা যায়, এসব দেশে লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। তাদের গবেষণা প্রবন্ধটি প্রকাশ করেছে ইউরোপিয়ান জার্নাল অব পলিটিক্যাল ইকোনমি।

 

গবেষণায় বলা হয়েছে, বাজেট ঘাটতি কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং শ্রমবাজার উদারীকরণের মতো কঠোর শর্ত পূরণ করতে গিয়ে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। চাকরি হারানোর পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানও কমে গেছে।

 

বাংলাদেশের বাস্তব অভিজ্ঞতাও গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে মিলে যায়। কোভিড-পরবর্তী সময়ে তীব্র ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক খাতের অস্থিরতার প্রভাবে ২০২২ সালের শেষ দিকে শেখ হাসিনার সরকার আইএমএফের কাছে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চায়। ঋণ পেতে মেনে নিতে হয় অর্ধশতাধিক শর্ত।

 

আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহারও বাড়ানো হয়। ফলে ব্যাংক ঋণের সুদ বেড়ে যায় এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সংকুচিত হয়। সরকারি খরচেও কৃচ্ছ্রসাধন শুরু হয়। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) ছোট করা হয়। এসব উদ্যোগের ফলে কর্মসংস্থান হ্রাস পায় এবং তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বেড়ে যায়।

 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০২৩ সালে ১০.৯ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে বেড়ে ১১.৪৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী প্রায় ২০ লাখ তরুণ এখন বেকার।

 

বাংলাদেশের মতো পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও আফ্রিকার দেশ কেনিয়াও আইএমএফ ঋণের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে কর্মসংস্থান সংকোচন ও দারিদ্র্যের মুখে পড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন ‘Bandage on a Bullet Wound’ এ দেখানো হয়, আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত ৩৩টি দেশ সরকারি খরচ কমানো, নিয়োগ স্থগিত ও বেতন কাটার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। এর প্রভাবে কর্মসংস্থান ও সামাজিক সেবা খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

 

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, সরকার সবকিছুতেই আইএমএফের শর্তের দোহাই দিচ্ছে। করপোরেট ট্যাক্স কমানো, রপ্তানি ভর্তুকি বজায় রাখা কিংবা খেলাপি ঋণের শর্ত সহজ করার মতো বিষয়ে ব্যবসায়ীদের দাবি সরকার উপেক্ষা করছে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ কার্যত থমকে গেছে।

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় মাত্র ৬.৫ শতাংশ, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে তো ঋণ প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়ে গেছে।

 

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) জানিয়েছে, নতুন অর্থবছরের শুরুতে এডিপি বাস্তবায়নও আশানুরূপ হয়নি। জুলাই-আগস্টে বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২.৩৯ শতাংশ।

 

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, বিনিয়োগ বাড়াতে কেবল সুদের হার নয়, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি সংকট ও দক্ষ জনশক্তির অভাবের মতো বিষয়গুলোও সমানভাবে দায়ী। তিনি বলেন, “বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত না হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়।”

 

অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “সুদহার দুই বছরের বেশি সময় বেঁধে রাখা হয়েছিল, তবুও বিনিয়োগ বাড়েনি। তাই কেবল সুদহার বৃদ্ধিকে দায়ী করা যাবে না। বরং কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।”

 

বাংলাদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রধান উৎস ছিল সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় ক্ষেত্রেই স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি দ্রুত কাঠামোগত সংস্কার ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা না যায়, তবে তরুণদের বেকারত্ব আরও বাড়বে এবং এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করবে।

সব খবর

আরও পড়ুন

জাতিসংঘের মূল্যায়নে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশে

প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমাল বিশ্বব্যাংক জাতিসংঘের মূল্যায়নে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশে

ভারত বয়কটের ডাক দিয়ে ভারত থেকে আমদানি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম অর্থবছর (২০২৪-২৫) ভারত বয়কটের ডাক দিয়ে ভারত থেকে আমদানি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি

রপ্তানি কমতে কমতে ঋণাত্মক ধারায় চলছে দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি

অর্থবছরের প্রথমার্ধ শেষ রপ্তানি কমতে কমতে ঋণাত্মক ধারায় চলছে দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি

‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ’ নিয়ে এনজিও খাতের উদ্বেগ

‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ’ নিয়ে এনজিও খাতের উদ্বেগ

ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ালো ৮.৪৯ শতাংশ

খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিই প্রধান অনুঘটক ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ালো ৮.৪৯ শতাংশ

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে লেনদেন শুরু

টাকা তুলতে চরম ভোগান্তি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে লেনদেন শুরু

১২০০ টাকার এলপিজির জন্য গুণতে হচ্ছে ২০০০ টাকা

সরকারের উদাসীনতায় ভোক্তার নাভিশ্বাস ১২০০ টাকার এলপিজির জন্য গুণতে হচ্ছে ২০০০ টাকা

অর্থনীতির শুভ বছর আসবে কবে?

অর্থনীতির শুভ বছর আসবে কবে?