বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রায় চার দশকের মধ্যে এই প্রথম সরকারকে নিয়মিত পরিচালন ব্যয় মেটাতেই ঋণ নিতে হয়েছে। অর্থাৎ বেতন-ভাতা, সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি ও দৈনন্দিন প্রশাসনিক খরচ চালাতে রাজস্ব আয় যথেষ্ট হয়নি। উন্নয়ন ব্যয় তো দূরের কথা, রাষ্ট্রের নিয়মিত চাকা সচল রাখতেই ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
এই বাস্তবতায় দায়িত্ব নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। তাদের সামনে প্রথম বাজেট, যা আগামী জুনে ঘোষণা হওয়ার কথা, হয়ে উঠতে পারে এক কঠিন আর্থিক পরীক্ষা। একদিকে রয়েছে নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চাপ, অন্যদিকে সীমিত রাজস্ব আয়, উচ্চ সুদ ব্যয় ও ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিচালন ব্যয় মেটাতে ২৩ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা ঋণ নিতে হয়েছে। একই সময়ে রাজস্ব আয় বেড়েছে মাত্র ৬.৪ শতাংশ, কিন্তু পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ১৫.৫ শতাংশ। ফলে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৪ মাসে মোট সরকারি ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মিলিয়ে মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকায়।
অভ্যন্তরীণ ঋণের ক্ষেত্রেও ব্যাংকনির্ভরতা বেড়েছে। ২০২২ সালে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বেড়ে হয়েছে ৭ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হয়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়া, আগের সরকারের রেখে যাওয়া বকেয়া দায়, ভর্তুকি ও সুদ পরিশোধের চাপ এবং টাকার অবমূল্যায়ন বর্তমান সংকটের মূল কারণ। কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম হওয়ায় ঋণনির্ভরতা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিএনপি সরকার নির্বাচনি অঙ্গীকার হিসেবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ, ফ্যামিলি কার্ড চালু, কৃষিঋণ মওকুফ এবং সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব বাস্তবায়নে অতিরিক্ত কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। রাজস্ব আয় না বাড়লে ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজস্ব কাঠামো সংস্কার ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। করজাল সম্প্রসারণ, ভ্যাট ও আয়কর প্রশাসনের ডিজিটাল সংস্কার, কর অব্যাহতির যৌক্তিকীকরণ এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে কঠোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। অন্যথায় ঋণচক্র আরও ঘনীভূত হবে।
নতুন সরকারের প্রথম বাজেট তাই শুধু আর্থিক দলিল নয়, এটি হতে যাচ্ছে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার প্রথম বড় পরীক্ষা। প্রশ্ন এখন—রাজস্ব সংস্কার ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে তারা কতটা সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারে।