বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় কম হলেও বিদেশি ঋণ দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। বাজেট ঘাটতি পূরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষায় সরকার প্রকল্প ঋণের পরিবর্তে দ্রুত ছাড়যোগ্য বাজেট সহায়তা ঋণের ওপর নির্ভর করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টাকার অবমূল্যায়ন। ফলে মাত্র তিন বছরে বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের মোট বিদেশি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২২ সালের জুনের তুলনায় ৯২ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ তিন বছরে ঋণের অঙ্ক প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ ৯ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা ঋণ পেয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই এসেছে ৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৬৯ শতাংশ বেশি। বিপরীতে একই সময়ে প্রকল্প ঋণের ছাড় ২৯ শতাংশ কমেছে।
ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় ঋণের চাপ আরও বেড়েছে। কয়েক বছর আগে যেখানে প্রতি ডলার ছিল প্রায় ৮৫ টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে ১২২ টাকার কাছাকাছি। এতে ঋণের অঙ্ক টাকার হিসাবে আরও বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা। এতে জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা এবং বাকিটা বিদেশি ঋণ।
ঋণের সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের চাপও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকার সুদ বাবদ ব্যয় করেছে ৩১ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ বেড়েছে ৮০ শতাংশ। পরিচালন ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশই এখন সুদ পরিশোধে যাচ্ছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বৈদেশিক ঋণের দায় দাঁড়িয়েছে ৭৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। গত পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বাজেট সহায়তা ঋণ স্বল্পমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনলেও দীর্ঘমেয়াদে ঋণের চাপ বাড়াচ্ছে। তাদের মতে, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, উচ্চ সুদের ঋণ এড়িয়ে চলা এবং দ্রুত ফলদায়ক প্রকল্পে সীমিত ঋণ নেওয়াই হতে পারে সমাধান। অন্যথায় সুদ পরিশোধই সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত হয়ে উঠবে, যা উন্নয়ন ব্যয়কে আরও সংকুচিত করবে।