অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে নানা উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় আশিক চৌধুরীকে। ঢাকায় আয়োজন করা হয় বিনিয়োগ সম্মেলন, প্রধান উপদেষ্টা বিভিন্ন দেশ সফরে গিয়ে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। কিন্তু বাস্তবে বিদেশি বিনিয়োগের চিত্র আশানুরূপ হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাজ্য থেকে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) নিট প্রবাহ কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকেও বিনিয়োগের চেয়ে বেশি অর্থ প্রত্যাবাসিত হয়েছে। চীন থেকেও নিট এফডিআই প্রবাহ কমেছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। অথচ এসব দেশ সফরে গিয়ে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছিল।
বিডার তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ অর্থবছরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ৫৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৮ শতাংশ কম। প্রস্তাবিত প্রকল্পের সংখ্যাও কমেছে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের আগ্রহে বড় ধরনের ভাটা পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিনিয়োগ আকর্ষণে মূল প্রতিবন্ধকতা দূর না করে শুধু প্রচারণা চালানো হয়েছে। ব্যবসায় পরিবেশবান্ধব পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। স্থানীয় বিনিয়োগও বাড়ছে না। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যবসা সহজ করার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্নীতি ও সুশাসনের ঘাটতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে এসব সমস্যার সমাধান জরুরি।
বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করেছেন, বিডার অনুমোদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির। একটি বিদেশি আইসক্রিম কোম্পানির ফ্র্যাঞ্চাইজি আনার জন্য মাত্র ৩০ হাজার ডলার পাঠানোর অনুমোদন পেতে তিন মাস সময় লেগেছে। এ ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।
চীনের এক ব্যবসায়ী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢাকার বিমানবন্দরে ‘অন অ্যারাইভাল ভিসা’ পেতে দীর্ঘ ভোগান্তির অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। তিনি বলেছেন, মাত্র চার ঘণ্টার ফ্লাইট শেষে ভিসা প্রক্রিয়ায় আরও এক থেকে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। তাঁর মতে, এটি বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটন আকর্ষণে বড় বাধা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের জিডিপি ৫৫ লাখ কোটি টাকা হলেও বিনিয়োগ নিবন্ধন সীমাবদ্ধ রয়েছে মাত্র ১ থেকে দেড় লাখ কোটি টাকার মধ্যে। প্রকৃত বিনিয়োগ আরও কম।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সরকার যদি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে প্রকৃত সমস্যা ও বাধাগুলো তুলে ধরত, তাহলে পরিস্থিতি উন্নত হতে পারত। কিন্তু বাস্তব চিত্র না দেখিয়ে শুধু আশার কথা প্রচার করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধরনের পতন হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা জরুরি হয়ে পড়েছে।