রাজধানীর পান্থকুঞ্জ পার্কে আবারও শুরু হয়েছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ। কয়েক মাস আগে পরিবেশকর্মীদের আন্দোলন ও হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা আদেশে কাজ বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি সেখানে নতুন করে কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, সরকারের এই ভূমিকা তাদের হতাশ করেছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে টানা কয়েক মাস পান্থকুঞ্জ পার্ক ও হাতিরঝিল জলাধারে এক্সপ্রেসওয়ে সংযোগ সড়ক প্রকল্প বাতিলের দাবিতে আন্দোলন হয়। ১৫০ দিনের বেশি সময় ধরে পরিবেশকর্মীরা অবস্থান নেন। সে সময় পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ কয়েকজন উপদেষ্টা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং আলোচনার আশ্বাস দেন। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে আদালত উন্মুক্ত স্থানে নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দেন। তবুও আবার কাজ শুরু হওয়ায় আন্দোলনকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পরিবেশকর্মীদের প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তী সরকার পার্ক-মাঠ-জলাশয় দখল রোধ করবে। কিন্তু বর্তমান সরকারও অতীতের মতো পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলনকারীদের কথা শোনার প্রয়োজন মনে করেনি সরকার।
শুধু পান্থকুঞ্জ নয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিশুপার্ক সংস্কারের নামে বড় অংশ কংক্রিটে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। উদ্যানে আনসার ক্যাম্প নির্মাণ হয়েছে এবং ওয়াকওয়ে তৈরির নামে কংক্রিটের আচ্ছাদন দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশকর্মী নয়ন সরকার বলেন, উদ্যানে গাছ কাটা শুরু হয়েছে এবং আরও গাছ কাটার পরিকল্পনা রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন মাঠ ও জলাশয়ও দখল হচ্ছে। আজিমপুর স্টাফ কোয়ার্টারের বড় মাঠে আবাসন প্রকল্প, রামপুরা মাঠে ভবন নির্মাণ, খিলগাঁও ঝিলে থানা নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওসমানী উদ্যানে নতুন করে কংক্রিটের আচ্ছাদন দেওয়া হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় মিরপুরের কালশী মাঠ, কলোনি মাঠ ও মোহাম্মদপুরের টাউন হল পার্ক জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের আবাসন প্রকল্পে হারানোর পথে। ডিএনসিসি জানিয়েছে, এসব স্থানের মালিকানা তাদের নয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, আগে পরিবেশ আন্দোলনকারীরা সরকারবিরোধী প্রকল্পে সরব হতেন। এখন পরিবেশ ধ্বংস হলেও আন্দোলন নেই। এটি পরিবেশ আন্দোলনের জন্য খারাপ খবর।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জানিয়েছে, তাদের জাতীয় সম্মেলনের কারণে বড় কর্মসূচি না থাকলেও পান্থকুঞ্জ পার্ক রক্ষায় তারা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে এবং সম্মেলনে নিন্দা জানিয়েছে।
স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, সরকার চাইলে অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নিয়েও পান্থকুঞ্জের এক্সপ্রেসওয়ে শাখা বাতিল করতে পারত। দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ক্ষতি ও জনক্ষোভ এড়াতে এটি যৌক্তিক হতো। তবে তিনি মনে করেন, নির্বাচনের আগে পরিবেশ আন্দোলনে স্থবিরতা এসেছে। নির্বাচিত সরকার এলে আন্দোলন আবার জোরদার হবে।
তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা আন্দোলনের কর্মী সৈয়দা রত্না বলেন, বর্তমান সরকারের কার্যক্রমে তারা হতাশ। পান্থকুঞ্জে দিনের পর দিন অবস্থান করেও কোনো সহযোগিতা পাননি।
সার্বিকভাবে, ঢাকার মাঠ, পার্ক ও জলাশয় দখল এবং কংক্রিটের আচ্ছাদন নিয়ে পরিবেশ আন্দোলনে নীরবতা দেখা দিয়েছে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া রাজধানীর পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়।