একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নৌ-কমান্ডোদের পরিচালিত অপারেশন ‘জ্যাকপট’ ও ‘হটপ্যান্টস’ পাকিস্তানি বাহিনীর নৌশক্তিকে কার্যত বিপর্যস্ত করে দেয়। এসব অভিযানের মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ত্বরান্বিত হয়। এই অভিযানের নেপথ্যে ছিলেন বাংলার দামাল ছেলেদের নিয়ে গঠিত এক বিশেষ বাহিনী—নৌ-কমান্ডো দল।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ভাগীরথী নদীর তীরে, ঐতিহাসিক পলাশীর প্রান্তরে স্থাপিত ক্যাম্পেই নৌ-কমান্ডোদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ১৭৫৭ সালে যেখানে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটেছিল, সেই মাঠেই ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের তাঁবু বসানো হয়। ভারতীয় নৌবাহিনীর তিনজন অফিসারের নেতৃত্বে ৪৮০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে বাছাই করা হয়।
১৯৭১ সালের ১১ জুন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে বলেন, “নৌ-কমান্ডো মানে সুইসাইড স্কোয়াড। এর মানে একশ ভাগ মৃত্যু।” তার বক্তব্যের পর ৩৪৫ জন সরে দাঁড়ান, শেষ পর্যন্ত ১৩৫ জন ভয়ংকর প্রশিক্ষণে অংশ নেন।
এই ক্যাম্পে যোগ দেন ফ্রান্স থেকে জীবন বাজি রেখে পালিয়ে আসা আটজন বাংলাদেশি সাবমেরিনার। তারা ছিলেন আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী, আবদুর রাকিব মিয়া, সৈয়দ মোশারফ হোসেন, মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ, আহসানউল্লাহ, আমিনউল্লাহ শেখ, আবদুর রহমান ও বদিউল আলম। পাকিস্তান নৌবাহিনীর সাবমেরিনে প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধের খবর পেয়ে পালিয়ে ভারতে আসেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলের ছাত্রসহ চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনার তরুণরা এই প্রশিক্ষণে অংশ নেন। প্রতিদিন প্রায় ১৮ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ চলত। ভোরে ব্যায়াম ও দৌড়, এরপর নদীতে সাঁতার, দুপুরে ক্লাস ও কমব্যাট জুডো, সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত আবার নদীতে সাঁতার। বর্ষাকালে মৃতদেহ, বিষাক্ত সাপ ও তীব্র স্রোতের মুখে সাঁতার কাটতে হতো।
প্রশিক্ষণ ছিল অত্যন্ত কঠিন—শব্দ না করে নদীতে নামা, সাঁতরানো, তীরে ওঠা সবকিছু নিঃশব্দে করতে হতো। শত্রুপক্ষের কাছে মাইন রেখে বিস্ফোরণের আগেই নিরাপদ দূরত্বে ফিরে আসাই ছিল মূল কৌশল।
চট্টগ্রাম, খুলনা, মোংলা, নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুর বন্দরের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর নৌযোগাযোগ ছিন্ন করাই ছিল নৌ-কমান্ডোদের মূল লক্ষ্য। তাদের দুঃসাহসী অভিযানে পাকিস্তানি নৌবাহিনী বিপর্যস্ত হয়।
নৌ-কমান্ডো আতহার উদ্দিন তালুকদার তার বইয়ে লিখেছেন, “ক্যাম্পটি ছিল শান্ত ও নীরব। আখক্ষেত আর বাবলা গাছ ঘেরা মাঠে চলত আমাদের পিটি, দৌড়, কুস্তি।” নৌ-কমান্ডো মাহবুবুর রহমান বলেন, প্রশিক্ষণ শুরুর আগে বন্ড পেপারে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল—যুদ্ধে মৃত্যু হলে কেউ দায়ী নয়।
১৯৭১ সালের মে মাস থেকে চরম গোপনীয়তার সঙ্গে শুরু হওয়া এই প্রশিক্ষণই মুক্তিযুদ্ধে নৌ-কমান্ডোদের জন্ম দেয়। ভাগীরথী নদীর তীরে গড়ে ওঠা সেই ‘সুইসাইড স্কোয়াড’ জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানি বাহিনীর নৌশক্তি ধ্বংস করে স্বাধীনতার পথ সুগম করে। তাদের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের ফলেই জন্ম নেয় বাংলাদেশ নামে একটি নতুন রাষ্ট্র।