সর্বশেষ

১২ মার্চ ১৯৭১

অসহযোগ আন্দোলনের পঞ্চম দিনে পাড়ায় পাড়ায় মহিলা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের আহ্বান

ফিচার ডেস্ক বিডি ভয়েস
প্রকাশিত: ১২ মার্চ ২০২৬, ১৪:৫২
অসহযোগ আন্দোলনের পঞ্চম দিনে পাড়ায় পাড়ায় মহিলা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের আহ্বান

১৯৭১ সালের ১২ মার্চ ছিল ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনের পঞ্চম দিন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সেদিনও সারাদেশে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চলতে থাকে। পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির গণআন্দোলন তখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যা বিশ্বের নজর কাড়ে।

 

সেদিন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়। ব্রিটেনের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী শক্তি প্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে পত্রিকাটি সতর্ক করে দিয়ে লিখেছিল, এ ধরনের বলপ্রয়োগ হবে “নিষ্ফল ও বিপজ্জনক”। পরিস্থিতির ক্রমাবনতির আশঙ্কায় ঢাকায় কর্মরত জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

 

এদিন নারীদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কবি ও সমাজকর্মী সুফিয়া কামাল-এর সভাপতিত্বে তোপখানা রোডে সারা আলীর বাসভবনে মহিলা পরিষদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভা থেকে পাড়ায় পাড়ায় “মহিলা সংগ্রাম পরিষদ” গঠনের আহ্বান জানানো হয়। স্বাধীনতার আন্দোলনে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। এই উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় নারীসমাজকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

 

অসহযোগ আন্দোলনের সেই সময়টিকে ইতিহাসবিদরা বিশ্বের অন্যতম সফল গণআন্দোলন হিসেবে উল্লেখ করেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় আন্দোলন চললেও তিনি সাধারণ মানুষের কষ্ট যেন না বাড়ে, সে জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সরকারি অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন তার আহ্বান মেনে অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেয়।

 

১২ মার্চের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল পাকিস্তানি প্রশাসনের অভ্যন্তরেও বাঙালিদের মধ্যে সমর্থন বাড়তে থাকা। পাকিস্তানের শাসন কাঠামোর অংশ হিসেবে পরিচিত সিএসপি আমলাদের একটি অংশ প্রথমবারের মতো বাঙালির গণআন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। একই দিন সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সমন্বয় পরিষদ বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে সভা করে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা মেনে চলার শপথ নেয় এবং চাকরি থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।

 

সেদিন ঢাকার রাজপথেও ছিল প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের দৃশ্য। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কে মিছিল ও পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। মগবাজারে এক ছাত্র সমাবেশে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা বক্তব্য দেন। ছাত্রনেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ স ম আব্দুর রব ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন ব্যবসায়ীদের দ্রব্যমূল্য না বাড়ানোর জন্য সতর্ক করে দেন।

 

অন্যদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছিল আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান জোরদারের প্রচেষ্টা। ঢাকায় অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর ওয়ার্কিং কমিটির সভায় শোষিত জনগোষ্ঠীর ঐক্যের আহ্বান জানানো হয়। একই দিনে ময়মনসিংহ থেকে প্রবীণ নেতা মাওলানা ভাসানী জনগণকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাঙালি জনগণ তাদের অধিকার আদায়ে কোনো আপস মেনে নেবে না।

 

১২ মার্চ ১৯৭১-এর ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, স্বাধীনতার সংগ্রাম তখন শুধু রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ছাত্র, শ্রমিক, নারী, কর্মচারীসহ সমাজের সব স্তরের মানুষ এতে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছিল। সেই ঐতিহাসিক দিনের ঘটনাগুলোই পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের দিকে জাতিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেয়।

সব খবর

আরও পড়ুন

বৈশ্বিক পর্যটন মানচিত্রে ব্রাত্য বাংলাদেশ

অপূর্ব নিসর্গ হয়েও পর্যটকহীন বৈশ্বিক পর্যটন মানচিত্রে ব্রাত্য বাংলাদেশ

ভাগীরথী নদীর তীরে ‘সুইসাইড স্কোয়াড’

স্মৃতিতে একাত্তর ভাগীরথী নদীর তীরে ‘সুইসাইড স্কোয়াড’

সংস্কৃতির ওপর কালো ছায়া

বছর শেষে বাংলাদেশ সংস্কৃতির ওপর কালো ছায়া

নারীদের ক্রীড়াঙ্গনে দাপটের বছর

ফিরে দেখা ২০২৫ নারীদের ক্রীড়াঙ্গনে দাপটের বছর

পালাতে থাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, কূটনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক উত্তেজনায় উত্তাল এক দিন

৯ ডিসেম্বর ১৯৭১: বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ পালাতে থাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, কূটনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক উত্তেজনায় উত্তাল এক দিন

বেগম রোকেয়ার শিক্ষাব্রত

রোকেয়া দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি বেগম রোকেয়ার শিক্ষাব্রত

স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে বাঙালি, বিশ্বরাজনীতির ময়দানে পাকিস্তানের পতন

একাত্তরের এই দিন | ৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে বাঙালি, বিশ্বরাজনীতির ময়দানে পাকিস্তানের পতন

৪ ডিসেম্বর ১৯৭১: বিজয়ের পথে মুক্তিযুদ্ধের মোড় ঘোরানো এক দিন

জাতিসংঘে উত্তেজনা, রণাঙ্গনে দুর্বার অগ্রগতি ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১: বিজয়ের পথে মুক্তিযুদ্ধের মোড় ঘোরানো এক দিন