বাউল শিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তারের পর তার সহধর্মিণী ও সহশিল্পী আলেয়া বেগম গভীর বেদনা প্রকাশ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, আবুল সরকারের ভক্তরা তাকে একনজর দেখতে আসার পথে হামলার শিকার হয়েছেন। আলেয়া বেগম বলেন, “আমরা যারা বাউল, আমাদের পথ শান্তির। আমরা মার খেতে জানি, কিন্তু কাউকে মারতে জানি না।”
২৩ নভেম্বর রবিবার তিনি জানান, তাদের বিরুদ্ধে ধর্মে আঘাতের অভিযোগ তোলা হয়েছে। অথচ যারা নিজেদের ধার্মিক দাবি করছেন, তারাই এখন ফাঁসির দাবি করছে। তিনি বলেন, “আমাদের ধর্মে কারো ক্ষতি চাওয়ার জায়গা নেই। আল্লাহকে নিয়ে বাজে কথা বলার প্রশ্নই আসে না।”
আলেয়া বেগম ব্যাখ্যা করেন, আবুল সরকার একজন পালাগানের শিল্পী। পালাগানে দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়, দীর্ঘ সময় ধরে নানা প্রসঙ্গ আসে। এতে অনেক সময় আধ্যাত্মিক দর্শন, দেহতত্ত্ব ও পরম সত্তার সঙ্গে একত্বের ধারণা প্রকাশ পায়। তিনি বলেন, “বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর সম্পর্কের মতোই আল্লাহর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। সেখানে ভয় নেই, আছে ভালোবাসা।”
তিনি আরও বলেন, “আমার মালিক, আমার আল্লাহ সর্বক্ষণ আমার সঙ্গে আছেন। আমি তাঁকে কখনো হারাই না। যারা সবকিছু নিজের বলে দাবি করে, তারাই ভয় পায়। আমি তো নিজেকে তাঁর করে দিয়েছি।”
আলেয়া বেগম জানান, আবুল সরকারকে ১৯ নভেম্বর রাতে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে তোলার খবর শুনে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৫০ হাজার ভক্ত ছুটে আসেন। তারা আশা করেছিলেন, হয়তো জামিন হবে, অন্তত একবার দেখা যাবে। তিনি বলেন, “আমি তাদের আটকাতে পারিনি। বলেছি—আসো বাবা, ভাগ্য থাকলে এক নজর দেখতে পাবে।”
কিন্তু পথে ভক্তদের ওপর হামলা হয়। আলেয়া বেগম বলেন, “তাদের চেহারা, বাবড়ি চুল, গলায় গামছা দেখে বোঝা যায় তারা বাউল। তাদের দিকে ধাওয়া করা হয়েছে, অনেককে মারধর করা হয়েছে। কারো মাথা ফাটানো হয়েছে, কাউকে দূরে তাড়ানো হয়েছে।” তিনি জানান, পরে ফোনে খবর পান—অনেকের মাথা ফেটে রক্ত ঝরছে। তিনি বলেন, “আমি বলেছি হাসপাতালে ভর্তি করো। তারপর বলেছি—থাক বাবা, মাইর খাও। কারণ আমরা যারা এই পথে আছি, আমরা মার খেতে জানি, কাউকে মারতে জানি না।”
আলেয়া বেগম মনে করেন, আবুল সরকার একজন জ্ঞানী বাউল, যিনি বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তিনি বলেন, “অনেক মানুষ আছেন যারা বাউল গান না শুনলে শান্তি পান না। শান্তি তো শুধু ধন-দৌলতে আসে না। আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই হয় না।”
গ্রেপ্তারের পর আবুল সরকার তাকে বলেছেন, “এই অবস্থাও মালিকের ইশারা। জেল, কারাগার—সবই তাঁর জায়গা। মালিক কোথাও অনুপস্থিত নন।”
আলেয়া বেগমের বক্তব্যে উঠে এসেছে বাউলদের শান্তিপূর্ণ জীবনদর্শন, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, বাউলরা কখনো কারো ক্ষতি চান না, বরং ভালোবাসা ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেন।