অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের রহস্যজনক মৃত্যুর মিছিলে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও শিক্ষাবিদ উপাধ্যক্ষ শামীকুল ইসলাম সরকার লিপন। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) মধ্যরাতে কারাগারে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে তাকে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
গাইবান্ধা জেলা কারাগারের জেলার আতিকুর রহমান জানান, লিপন গাইবান্ধা সদর থানার জিআর ১৭৬/২৫ মামলায় হাজতি হিসেবে আটক ছিলেন। এর আগেও তিনি কারাগারে থাকা অবস্থায় চিকিৎসা নিয়েছিলেন।
পরিবারের দাবি, প্রায় দেড় বছর ধরে একটি ‘মিথ্যা মামলায়’ তিনি কারাবন্দি ছিলেন। গত বছরের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার মগবাজার এলাকা থেকে ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে পলাশবাড়ী থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। একাধিকবার হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলেও জেলগেট থেকে পুনরায় গ্রেপ্তারের অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ ৫ ফেব্রুয়ারি জামিনে মুক্তির পর আবারও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় বলে স্বজনরা জানান।
লিপন ১৯৯৬ সালে পলাশবাড়ী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। পরে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, ২০১৬ সালে সাধারণ সম্পাদক এবং ২০১৮ সাল থেকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাশাপাশি তিনি পলাশবাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজে প্রভাষক ও পরবর্তীতে উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তার মৃত্যুকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে কিছু সংগঠন মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে বলেছে, বারবার জামিনের পর পুনরায় গ্রেপ্তার এবং চিকিৎসা প্রাপ্তির বিষয়ে প্রশ্নের সুষ্ঠু জবাব প্রয়োজন।
তার মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ধারাবাহিক মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে এটি নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। লিপন ২০২৬ সালে কারা হেফাজতে হত্যার শিকার হওয়া ৪র্থ আওয়ামী লীগ নেতা। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই ঘটনা হেফাজতে মৃত্যুর উদ্বেগজনক ধারারই অংশ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের কারাগারে ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৬৯ জনই ছিলেন বিচারাধীন বন্দী।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে কারাগার বা পুলিশ হেফাজতে পঞ্চাশাধিক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। বগুড়ায় এক মাসে চারজন, নওগাঁয় এক সপ্তাহে সাতজন, গাইবান্ধার তারিক রিফাত, মুন্সীগঞ্জের সারোয়ার হোসেন নান্নু, কাশিমপুরের ওয়াসিকুর রহমান বাবু, পাবনায় প্রলয় চাকী, নারায়ণগঞ্জে হুমায়ুন কবির, দিনাজপুরে রমেশ চন্দ্র সেন সহ আরও অনেকের মৃত্যুর ঘটনা আলোচনায় এসেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ ‘বয়সজনিত অসুস্থতা’, ‘হৃদ্রোগ’ বা ‘পূর্ব-অসুস্থতা’র কথা বললেও স্বজন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো নির্যাতন, চিকিৎসা অবহেলা ও পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ তুলে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানাচ্ছে।
লিপনের মৃত্যু রাজনৈতিক বন্দিদের নিরাপত্তা, চিকিৎসার অধিকার, জামিনের সুযোগ এবং কারাগারের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান নিয়ে জাতীয় বিতর্ক আরও তীব্র করেছে। মানবাধিকার কর্মীদের ভাষায়, “রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা প্রত্যেক নাগরিকের জীবন রক্ষার পূর্ণ দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।”