ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে সামগ্রিক প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ থাকলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার প্রয়োগে নানা সীমাবদ্ধতা এবং নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঊর্ধ্বগতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে সুশীল সমাজের চারটি সংগঠন। রাজধানীর গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য অবকাঠামোগত বাধা
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন বি-স্ক্যান জানায়, ভোটকেন্দ্রগুলোর অধিকাংশই প্রবেশগম্যতার ন্যূনতম মান পূরণ করেনি। মেহেরপুর, ফরিদপুর, দিনাজপুর এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আটটি আসনের ১০০টি কেন্দ্রে ১০০ জন প্রতিবন্ধী পর্যবেক্ষক কাজ করেন। তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়—বেশিরভাগ কেন্দ্রে র্যাম্প ছিল না; কোথাও থাকলেও তা ব্যবহারযোগ্য ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে ভোটকক্ষ তৃতীয় থেকে পঞ্চম তলায় স্থাপন করা হয়, যা শারীরিক প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ ভোটারদের জন্য কার্যত অগম্য হয়ে দাঁড়ায়।
দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল ব্যালট বা সাইনেজের ব্যবস্থা ছিল না। গোপন কক্ষের পর্দা মানসম্মত না হওয়ায় গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠে আসে। নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে সহায়তার নামে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ভোট প্রদানও উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বি-স্ক্যান পোস্টাল ব্যালট চালু, ভোটকক্ষ বাধ্যতামূলকভাবে নিচতলায় স্থাপন এবং আরপিওতে প্রতিবন্ধী-বান্ধব বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করেছে।

সংখ্যালঘু ভোটারদের অভিজ্ঞতা: আস্থা ও অসহযোগিতা
সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ২৫টি আসনের ৫০৯টি কেন্দ্রে পর্যবেক্ষণ চালানো রূপসা জানায়, নির্বাচনের আগে সহিংসতার আশঙ্কা থাকলেও ভোটের দিন ৯৮ শতাংশ কেন্দ্রে সময়মতো ভোটগ্রহণ শুরু হয় এবং নিরাপত্তা জোরদার ছিল। তবে ৪.২ শতাংশ কেন্দ্রে কর্মকর্তাদের আচরণ সংখ্যালঘু ভোটারদের প্রতি বন্ধুসুলভ ছিল না। ৮.৩ শতাংশ কেন্দ্রে রাজনৈতিক এজেন্টদের প্রভাবের চেষ্টা এবং ১৫.৮ শতাংশ কেন্দ্রে সীমানার ভেতরে থেকেও ভোট দিতে না পারার অভিযোগ পাওয়া যায়। গণনার সময় ৬.৫ শতাংশ কেন্দ্রে পর্যবেক্ষকদের পূর্ণ প্রবেশাধিকার না দেওয়ার বিষয়টিও প্রশ্ন তুলেছে।
নারী প্রার্থীদের ওপর অনলাইন হামলা
নারী অধিকারভিত্তিক সংগঠন আরশি ট্রাস্ট জানায়, ৮৫ জন নারী প্রার্থীর বড় অংশই প্রচারকালে ‘পরিকল্পিত ও সমন্বিত’ অনলাইন আক্রমণের শিকার হন। তাদের পেজ ও পোস্ট রিপোর্ট করে সরানোর চেষ্টা, অপপ্রচার ও ট্রলিং ছিল নিয়মিত। সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্স ২০২৫ থাকলেও কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায়নি। মাত্র ৭ জন নারী প্রার্থীর জয়কে তারা প্রতিকূল পরিবেশের প্রতিফলন হিসেবে দেখছে। অনলাইন জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট নীতি ও আইন প্রয়োগের দাবি জানানো হয়।
ভোট-পরবর্তী সহিংসতা বেড়েছে
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার জানায়, ১৮ জানুয়ারি থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৮ জেলায় ৬১টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। নির্বাচনের দিন ২২ আসনে ৪৫টি সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের পর সহিংসতায় ৩ জন নিহত—যার মধ্যে একজন শিশু—এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়। প্রায় ৬ শতাংশ ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষকরা দায়িত্ব পালনে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন।
সংগঠনগুলোর অভিমত, নির্বাচন সামগ্রিকভাবে শৃঙ্খলাপূর্ণ হলেও অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ, প্রবেশগম্যতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মান প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তারা সুপারিশ করেছে—প্রান্তিক ভোটারদের জন্য আইনি ও অবকাঠামোগত সংস্কার, পর্যবেক্ষকদের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা।