চলতি বছরের শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক মহাবিপর্যয়ের সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক দশকের বিশ্বায়ন দেশগুলোর অর্থনীতিকে একে অন্যের ওপর এতটাই নির্ভরশীল করে তুলেছে যে, এই সংকটের আঁচ এখন প্রতিটি দেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ 'হরমুজ প্রণালী' কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা সামলে বিশ্ব যখন মাত্র ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই এই নতুন যুদ্ধ এক ভয়াবহ ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ বা অর্থনৈতিক স্থবিরতার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেলে ৮৩-৮৪ ডলারে উঠলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি ১৫০ ডলার পর্যন্ত ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের ২০ শতাংশ এবং এলএনজি সরবরাহের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে।
ইরানের পক্ষ থেকে এই নৌপথটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকির পর আন্তর্জাতিক বীমা কোম্পানিগুলো এই রুটে চলাচলকারী জাহাজের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। ফলে সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিবহন খরচ, কৃষি উৎপাদন এবং শিল্প কারখানার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে এক গভীর মন্দার দিকে ধাবিত করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা কেবল তেল নয়, বরং প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করেছে। ড্রোন হামলার আশঙ্কায় সৌদি আরবের বৃহত্তম তেল শোধনাগার এবং কাতারের এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্রগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় দেশগুলো চরম জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে, ইউরোপ ও ব্রিটেনের অবস্থা আরও নাজুক। ব্রিটিশ নাগরিকদের বিদ্যুৎ বিল ও হিটিং খরচ আগামী জুলাই নাগাদ ব্যাপক হারে বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে এখন বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে— তারা কি সুদের হার বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি মন্দা এড়াতে হার কমিয়ে রাখবে?
এই সংকট বিশ্বকে একটি কঠোর বার্তা দিয়েছে যে, কেবল খনিজ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা যে কোনো সময় জাতীয় নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করতে পারে। তাই বর্তমানে গ্রিনপিসসহ বিভিন্ন সংগঠন দেশগুলোকে দ্রুত সৌর ও বায়ু শক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের চেয়ে বর্তমানে বিশ্বনেতাদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শান্তি স্থাপনের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা। যদি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এই উত্তেজনা প্রশমিত না হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি যে গভীর খাদে পড়বে, তা থেকে উত্তরণ সহজ হবে না বলে মনে করছেন ব্লুমবার্গ ও গার্ডিয়ানের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষকরা।