ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্থল, জল ও আকাশপথে ব্যাপক সামরিক হামলা সত্ত্বেও পরিস্থিতি দ্রুত একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিছু সাফল্য বয়ে আনলেও রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সামনে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
যুদ্ধের বিস্তার ও অনিশ্চয়তা
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এর পর থেকে ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ছে।

ওয়াশিংটনের জন হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ–এর বিশ্লেষক লরা ব্লুমেনফেল্ড বলেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সামরিক অভিযানে পরিণত হতে পারে। তার মতে, বিশ্ব অর্থনীতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর এটিই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী এবং কোথায় গিয়ে তা শেষ হবে সে বিষয়ে এখনও স্পষ্টতা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কী?
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিযানের মূল লক্ষ্য ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা, নৌবাহিনীর সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া এবং দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধের শুরুতে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও পরে সে বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেননি। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব টিকে থাকতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “ইরানের নতুন নেতাকে আমাদের অনুমোদন নিতে হবে। অনুমোদন না পেলে সে বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।” তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় ভবিষ্যতে যেন আবার একই ধরনের সংকট তৈরি না হয়।
তেলের বাজারে উদ্বেগ
এই যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালী। বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের হুমকির কারণে সেখানে তেলবাহী ট্যাঙ্কারের চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক আটলান্টিক কাউন্সিল–এর গবেষক জোশ লিপস্কি বলেন, অর্থনৈতিক দিক থেকে এই সংঘাতের প্রভাব হয়তো পুরোপুরি অনুমান করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি পেলে তা ভোটারদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
মিত্রদের মধ্যেও উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যের কিছু মিত্র দেশও এই যুদ্ধ নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্যবসায়ী খালাফ আল হাবতুর এক খোলা চিঠিতে প্রশ্ন তুলেছেন, “আমাদের অঞ্চলকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার অধিকার কে দিয়েছে?”
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন লেফটেন্যান্ট জেনারেল বেন হজেস বলেন, সামরিক কৌশল হিসেবে অভিযান সফল হতে পারে, তবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিণতি নিয়ে যথেষ্ট চিন্তা করা হয়নি বলে মনে হয়।

পাকিস্তানের জন্য কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ
এই সংঘাতের প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ এশিয়াতেও। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবে কঠিন অবস্থায় পড়েছে। দেশটির ইরানের সঙ্গে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক পাকিস্তানি শ্রমিক উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাকিস্তান এখন পর্যন্ত মূলত কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, তিনি ইরান ও সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। তিনি বলেন, রিয়াদের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টিও ইরানের নেতাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ কতদিন চলবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগে বলেছিলেন সংঘাত চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে, তবে সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে চাননি।
এদিকে যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তাহলে এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।