সর্বশেষ

গল্প

চৌদ্দ হাজার কোটি টাকা মাত্র

প্রকাশিত: ২৭ মার্চ ২০২৬, ০৪:১৭
চৌদ্দ হাজার কোটি টাকা মাত্র

আবিদ করিমের বয়স উনষাট হয়েছে। এপ্রিলের ১৮ তারিখ। আবিদ করিম মেষ রাশির জাতক। জ্যোতিষী কাজি এস. হোসেন একবার আবিদ করিমের হাত দেখেছিলেন। কাজী এস. হোসেন দৈনিক পত্রিকায় ‘আজকের দিনটি কেমন যাবে’ লিখতেন। কাজী এস. হোসেনের মৃত্যুর দুই দিন আগ থেকে সেই লেখা লিখছেন এ কে এম ওবায়েদ নূরু। কাজী এস. হোসেন মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে দুইদিন কোমায় থেকে মরেছেন। একেএম ওবায়েদ নূরু নামে একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ আছেন। ‘আজকের দিনটি কেমন যাবে’ কি বর্তমানে সেই ব্যক্তিই লিখেন? লিখতেই পারেন। কাজী এস. হোসেন সরকারী চিনিকলের কর্মকর্তা ছিলেন। রিটায়ার করে কিরো ও ভৃগুর বই পড়ে জ্যোতিষী হয়ে উঠেছিলেন। কাজী এস. হোসেন বলে গেছেন আবিদ করিম দীর্ঘায়ু হবেন। দীর্ঘ আয়ু বলতে কতটা? আবিদ করিম অশিতিপর হয়ে মরবেন? নবুতিপর হয়ে মরবেন? বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। আবিদ করিম যম একা। এতদিন কী করে বাঁচবেন?


উনষাট বছরের জীবনে আবিদ করিমের বড় ধরনের অসুখ হয়েছে তিনবার। একবার পায়ে ইনফেকশন, দুইবার হার্ট অ্যাটাক। পায়ে ইনফেকশন নিয়ে সতেরো দিন, হার্ট অ্যাটাক দুই দফায় যথাক্রমে তেইশ দিন ও উনিশদিন হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। ভয়াবহ কোনো অভিজ্ঞতা হয় নাই। এমআরআই করানোর কথা উঠেছিল, সেটা হলে হতো। আবিদ করিমের ক্লস্টোফোবিয়া আছে এবং সেটা মারাত্মক পর্যায়ের শুনে ডাক্তাররা রেহাই দিয়েছেন। আবিদ করিম বাসায় ফিরেছেন। ইন্টেরিম সরকার এর মধ্যে জারি হয়ে গেছে দেশে। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ব্যক্তি ইন্টেরিম সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হয়েছেন। কিছু মানুষ আশা করেছিল, কিছু মানুষ কিছুই আশা করে নাই। আবিদ করিম দ্বিতীয় দলে। ‘কিছু মানুষের আত্মা নিষ্করুন’—আবিদ করিমের বন্ধু পরিসংখ্যানবিদ মায়মূর কাজী বলেছেন, ‘আঠারো জনের।’
 

‘কী আঠারো জনের?’
‘এই পৃথিবীর আঠারো জনের আত্মা নিষ্করুন।’
‘অ। তুমি কি জরিপ করে দেখেছো?’
‘জরিপ করে দেখার কিছু নাই। আঠারো জন পৃথিবী চালায়, আঠারো জন দেশ চালায়, আঠারো জন শহর চালায়, আঠারো জন মহল্লা চালায়। আঠারো জন। সতেরো জন না, উনিশ জন না।’
‘আঠারো জন কেন?’
‘আঠারো একটা ভয়ংকর সংখ্যা। এক আর আট নয়। দশ হলে সেটা এক হয়ে যেতো। তিন শূন্য বসিয়ে দিলেও এক। আবার নয় আর নয়ে আঠারো এদিকে। এটা বিশেষ বৈশিষ্টমন্ডিত।’
 

আবিদ করিম কিছু বুঝেন নাই। কিছু বলেন নাই। সন্দেহ করেছেন মায়মূর কাজী মতিচ্ছন্নতায় আক্রান্ত হয়েছেন।
 

আঠারো মাসে বছর, কথা আছে। সেই হিসাবে মাত্র এক বছর তবে দেশে ছিল ইন্টেরিম সরকার। রিপিট, আঠারো মাসে বছর। আরে! আঠারো!
যে আঠারো জন পৃথিবী চালায় তাদের মধ্যকার শান্তিরক্ষার্থে আমাদের দেশের কেউ আছে? যে আঠারো জন দেশ চালায়, তাদের মধ্যে কি কেউ আছে আবিদ করিমের নিজের টাউনের?
 

আবিদ করিম বহুদিন তাদের টাউনে যান না। আর কখনো যাবেন কি না মানে যেতে পারবেন কিনা, সংশয়ের অবকাশ আছে এখন বলা যায়। একা জার্নি, কম দূর না। মা নাই, বাবা নাই, বড় আপা নাই, মেজো আপা নাই, পারিবারিকভাবে টাউনে আর কেউ নাই আবিদ করিমের। বাসাটা আছে। বিক্রি করে দেবেন। তার আগে যদি মরে যান, জুবায়ের দখল করে নিতে পারে। আলফ মামার ছেলে জুবায়ের। রাজনীতি করে। সমন্বয়ক ছিল। প্রকাশ্য গোপনে দুই নেতাকে সীমান্ত দিয়ে পার করে দিয়েছে— বন্ধু ইশতিয়াক আহমদ শামীম শিওরিটি দিয়ে ভিডিওকলে আবিদ করিমকে বলেছেন, কাফি দেওয়ান দুই কোটি টাকা, আবুল বকশ চৌধুরী তিন কোটি টাকা নগদ দিয়ে গেছেন জুবায়েরকে। টাকার চটের ব্যাগ ভাইরাল হয়েছিল। জুবায়েরের কত টাকা হয়েছে? কত টাকা লাগে একজন মানুষের?
 

নানারকম কথা শোনা যাচ্ছে। ইন্টেরিম সরকারের অমুক উপদেষ্টা চৌদ্দ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। তমুক উপদেষ্টা এগার হাজার কোটি টাকা, উপতমুক উপদেষ্টা আট হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। এত টাকা দিয়ে কী করবেন এরা? চৌদ্দ হাজার কোটি টাকা দিয়ে কী কেনা যায়? এগার হাজার কোটি টাকা দিয়ে প্রাইভেট জেট কেনা যায়? আট হাজার কোটি টাকা দিয়ে একটা কলোনিয়াল রেড লাইট এরিয়া কেনা যায়?
 

আবিদ করিমরা ‘মাসুদ রানা’ প্রজন্ম। কাজী আনোয়ার হোসেনের স্পাই থ্রিলার—‘মাসুদ রানা’ সিরিজ গোগ্রাসে গিলেছে স্কুল-কলেজ লাইফে। মাসুদ রানা সিরিজের একটা বই আছে, ‘মূল্য এক কোটি টাকা মাত্র!’
 

আবিদ করিম স্বচক্ষে কখনো এক কোটি টাকা মাত্র দেখেন নাই। তার যদি ১৪ হাজার কোটি টাকা হয়ে যায়?
 

চৌদ্দ হাজার কোটি টাকা মাত্র? বাংলাদেশ ব্যাংক কি চৌদ্দ হাজার কোটি একটাকার নোট জোগান দিতে পারবে?
 

চ্যাট জিপিটি আবিদ করিমকে বলেছে এক টাকার নোটে চৌদ্দ হাজার কোটি টাকা ক্যারি করতে হলে ‘সমগ্র বাংলাদেশ বিশ টন’ সাত হাজার ট্রাক লাগবে।—মাথা আউলা লাগে ভাবলে। বাল্ব সিনড্রোম ধরে আবিদ করিমকে। দ্বিতীয় বার হার্ট অ্যাটাকের পর আবিদ করিম এই সিনড্রোম আবিস্কার করেছেন। এই সিনড্রোমে আক্রান্ত হলে পৃথিবীর সব মানুষকে বাল্ব মনে হতে থাকে— বৈদ্যুতিন বাতি। কেউ টুনি বাল্ব, কেউ টিউব লাইট, কেউ এলইডি বাল্ব, কেউ পুরনো সেই দিনের কথা—পঁচিশ ওয়াটের গরীবগুর্বা বাতি।—সুইচ অফ করে দিলেই নাই। কেউ নাই কিছু নাই বাল্ব নাই ওয়াট নাই।
 

কাজী এস. হোসেন দীর্ঘায়ু বললেও সেটা কতদূর বাস্তবায়ন হবে, আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি না, আবিদ করিম ভাবেন না সেভাবে। ইংলিশে বাল্ব লিখতে দুইটা ‘B’ লাগে, বাংলায় লিখতে দুইটা ‘ব’ লাগে। চৌদ্দ হাজার কোটি টাকা পেয়ে গেলে একটা বাল্ব কারখানা খুলবেন আবিদ করিম। ইংলিশ বা বাংলায় একটা ‘B’ বা ‘ব’ বাদ দিয়ে হলেও। এত টাকা দিয়ে আর কী করবেন?

 

৭ মার্চ ২০২৬

সব খবর