রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন ফয়েজ উদ্দিন। মাসে আয় মাত্র ১৮ হাজার টাকা। তাঁর ছেলে শিহাব উদ্দিন ব্রেন টিউমারসহ জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অপারেশন, ওষুধ ও পথ্য মিলিয়ে প্রায় ৫ লাখ টাকার প্রয়োজন। এরই মধ্যে সঞ্চয়ের ২ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। ছেলেকে বাঁচাতে তিনি ৩ লাখ টাকা ঋণ করেছেন। কিন্তু জানেন না কীভাবে এ ঋণ শোধ করবেন।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর প্রায় ৬১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে ওষুধের পেছনে। ক্যানসার, হৃদরোগ, লিভার ও কিডনির চিকিৎসায় রোগীরা সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। স্বাস্থ্যসেবায় আস্থার সংকট কাটছে না। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন ৩২টি সুপারিশ করলেও এর একটিও বাস্তবায়ন হয়নি।
সরকারি হাসপাতালে অব্যবস্থাপনা, সংকট ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা প্রকট। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে প্রতারণা ও আস্থাহীনতা। জেলা শহর থেকে জরুরি রোগী নিয়ে ছুটতে হয় ঢাকায়। ঢাকার বাইরে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা গড়ে ওঠেনি। বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হলেও লুটপাট ও নয়ছয়ের কারণে পরিবর্তন আসেনি। টেস্টের মূল্য নির্ধারণ না থাকায় রোগীদের কাছ থেকে গলাকাটা দাম আদায় করা হয়। অপারেশন ও শয্যা ভাড়ার খরচও নির্দিষ্ট নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, “দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আস্থার সংকট আছে। চিকিৎসা খরচ বেশি, দুর্ভোগও বেশি। সরকারি হাসপাতালে কার্যকর সেবা নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালে সেবার দাম ও মান নির্ধারণ করে তা প্রকাশ করতে হবে। ক্যাটাগরি অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করতে হবে। ডায়াগনস্টিক সেবায় মান নিশ্চিত করতে হবে। প্রেসক্রিপশন অডিট চালু করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে ডায়াগনস্টিক সেবা জোরদার করতে হবে। রেফারেল পদ্ধতি চালু করতে হবে। হাসপাতাল থেকে দালাল ও বিদেশি এজেন্টদের উচ্ছেদ করতে হবে।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশে সরকারি মেডিকেল কলেজ, বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট, জেলা ও উপজেলা হাসপাতালসহ মোট ৭৫০টি সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে শয্যাসংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি, এর মধ্যে বেসরকারিতেই রয়েছে প্রায় ৯৫ হাজার। বেসরকারি রোগ নিরীক্ষা কেন্দ্র প্রায় ১০ হাজার এবং ব্লাড ব্যাংক ১৮০টি।
গবেষকেরা বলছেন, স্বাস্থ্যবিমা ছাড়া চিকিৎসা ব্যয় কমানো অসম্ভব। রোগের প্রকোপ বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়ও। অন্তর্বর্তী সরকার স্বাস্থ্যব্যবস্থা বদলানোর উদ্যোগের কথা বললেও কিছুই দৃশ্যমান হয়নি। ওষুধ সহজে পাওয়ার জন্য ‘ফার্মেসি নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে সরকারি ৭০০ হাসপাতালে এ উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কার্যকর না হওয়ায় সাধারণ মানুষের ওষুধের খরচ কমেনি।
বছরজুড়ে চিকিৎসক, নার্স, ইন্টার্ন চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে মুখর ছিল স্বাস্থ্য খাত। বদলির হিড়িকও ছিল তীব্র। ফলে স্বাস্থ্যসেবায় স্থিতিশীলতা আসেনি।
২০২৫ সালে স্বাস্থ্য খাতের মন্দ দশা কাটেনি। চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে, আস্থার সংকট গভীর হচ্ছে। সরকারি উদ্যোগ কার্যকর না হওয়ায় সাধারণ মানুষ চিকিৎসার ভারে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিমা ও কার্যকর সংস্কার ছাড়া এ সংকট কাটানো সম্ভব নয়।