সর্বশেষ

এশিয়ান লাইটের বিশ্লেষণ

রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাংলাদেশে দারিদ্র্য বাড়ছে, ব্যর্থতার কেন্দ্রে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার

প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর ২০২৫, ০১:৩২
“অন্তর্বর্তী প্রশাসন বিরোধী মতকে দমন করছে, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে, এবং প্রত্যাশিত রাষ্ট্রনায়কত্বও দেখাতে পারেনি।”
রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাংলাদেশে দারিদ্র্য বাড়ছে, ব্যর্থতার কেন্দ্রে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নীতিগত অদক্ষতার চাপে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার আবারও ঊর্ধ্বমুখী। লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এশিয়ান লাইট–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার পতনের পর বিনিয়োগে ধস, শিল্পোৎপাদনে স্থবিরতা এবং শ্রমবাজারে সংকোচন সব মিলিয়ে অর্থনীতি স্পষ্টভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে।

 

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাসে দেখা যায়, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ শতাংশে। প্রবৃদ্ধির এ সংকোচনের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দারিদ্র্যসীমায় বসবাসরত মানুষের সংখ্যায়। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা (প্রতিদিন ৩ ডলার, ২০২১ সালের ক্রয়ক্ষমতা সমতা অনুযায়ী) অনুযায়ী দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়তে পারে ৮.৯ শতাংশে, আর দরিদ্র মানুষের সংখ্যায় যোগ হতে পারে আরও অন্তত ৩০ লাখ।

 

সংকটের গভীরতা বোঝা যায় শ্রমবাজারের সামগ্রিক অবস্থান থেকে। ২০২৪ সালে কর্মসংস্থানের হার নেমে এসেছে ৫৬.৭ শতাংশে। বিশেষ করে সেবাখাতে ব্যাপক চাকরি হারানোর ঘটনা ঘটেছে। কৃষিখাতে নারীরা ও তরুণ শ্রমিকেরা কম দক্ষতা ও কম মজুরির ঘূর্ণিতে আটকে আছেন; অন্যদিকে শহুরে শ্রমবাজারে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য ভালো বেতনের কাজ নেই। ফলে তারা বাধ্য হয়ে চলে যাচ্ছেন স্বল্প মজুরির সেবাখাতে। এতে একদিকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদের অপচয় বাড়ছে, অন্যদিকে দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হওয়ার সুযোগ ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় আসার পর এক বছরের বেশি সময় ধরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মাধ্যমে স্থিতিশীলতা আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে পরিস্থিতি উল্টো দিকে গেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং আইএমএফের শর্ত পূরণ—কোনো ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই। শিল্পখাতে উৎপাদন কমে গেছে, বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষমাণ, ব্যাংকিং খাতে সংকট আরও গভীর। ফলে বেকারত্ব, আয়হ্রাস ও খরচ বৃদ্ধির সম্মিলিত চাপে সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন হয়ে উঠেছে।

 

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)-এর সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, দেশে এখন প্রতি চারজনের মধ্যে অন্তত একজন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন। ২০২২ সালের তুলনায় এ হার ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যা পুরো উন্নয়নযাত্রাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। শুধু দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষেরাই নয়, বরং যারা মাত্র একটি আয়হ্রাস, চিকিৎসা খরচ, বা জলবায়ুজনিত দুর্যোগে আয় হারাতে পারেন তারাও ঝুঁকির কিনারায় দাঁড়িয়ে। এক ধাক্কায় লাখো মানুষ নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন আয়ের শ্রেণিতে নেমে যাবার সম্ভাবনা বাড়ছে।

 

পিপিআরসি-এর আরেকটি গবেষণা দেখাচ্ছে, শহুরে পরিবারের ৫৫ শতাংশের বেশি ব্যয়ক্ষমতা এখন শুধুই খাদ্য কেনায় ব্যবহৃত হচ্ছে। খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা সঞ্চয়ের মতো প্রয়োজনীয় ব্যয়ে কমতি পড়ছে। এতে জীবনমানের দীর্ঘমেয়াদি অবনতি অনিবার্য হয়ে উঠছে। ২০২২ সালের পর থেকে ভোগ ঘাটতির ব্যবধান দ্বিগুণ হয়েছে, অর্থাৎ মানুষের প্রকৃত আয় ও জীবিকা অর্জনের সামর্থ্য যত কমছে, ততই কঠোর নীতিগত উদ্যোগের প্রয়োজন বাড়ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি সরকারের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা না আসে, আয়বৈষম্য ও দারিদ্র্য দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।

 

এশিয়ান লাইট–এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা শুধু অর্থনৈতিক নয় বরং মানবাধিকার, আইনশৃঙ্খলা ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও হতাশাজনক। প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়, “অন্তর্বর্তী প্রশাসন বিরোধী মতকে দমন করছে, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে, এবং প্রত্যাশিত রাষ্ট্রনায়কত্বও দেখাতে পারেনি।” এতকিছুর ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের উন্নয়নধারা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, আর বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা নীতিনির্ধারণে পুনর্বিবেচনা শুরু করেছে।

 

বাংলাদেশ এক সময় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির উদাহরণ ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও দুর্বল নীতিশাসনের চাপে উন্নয়ন অগ্রযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে আয়ের সুযোগ সংকুচিত; ফলে সীমিত আয়ের মানুষের জীবন হয়ে উঠছে আরও অনিশ্চিত এবং হতাশাজনক। প্রতিবেদনের ভাষায়—“দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী এখন দারিদ্র্যসীমার উপর এমনভাবে ঝুলে আছে, যেন একটি ছোট আঘাতেই তারা নিচে পড়ে যাবে।”

সব খবর

আরও পড়ুন

বার নির্বাচনে ‘হস্তক্ষেপ ও হয়রানি’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিটিশ ল সোসাইটির চিঠি

বার নির্বাচনে ‘হস্তক্ষেপ ও হয়রানি’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিটিশ ল সোসাইটির চিঠি

আওয়ামী লীগের করা হাজার কোটি টাকার পাইপলাইন ও মজুত সক্ষমতা ফেলে রেখেছে সরকার

সরকারের অদক্ষতায় জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকিতে আওয়ামী লীগের করা হাজার কোটি টাকার পাইপলাইন ও মজুত সক্ষমতা ফেলে রেখেছে সরকার

বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে থেকে যাবে ১২ লাখ মানুষ, নতুন করে দরিদ্র হবেন প্রায় ১৪ লাখ

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাংকের শঙ্কা বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে থেকে যাবে ১২ লাখ মানুষ, নতুন করে দরিদ্র হবেন প্রায় ১৪ লাখ

ইউনূস-নূরজাহানের জবাবদিহিতা ও বিচারের দাবিতে তীব্র জনমত

টিকাদানে অবহেলায় শিশু মৃত্যুতে ক্ষোভ ইউনূস-নূরজাহানের জবাবদিহিতা ও বিচারের দাবিতে তীব্র জনমত

উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও কেন দীর্ঘ লাইন ও ভোগান্তি?

বাংলাদেশে পেট্রোল-অকটেন সংকট উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও কেন দীর্ঘ লাইন ও ভোগান্তি?

নতুন দামে আরও চাপে মধ্যবিত্ত

এলপিজির দামে বড় লাফ নতুন দামে আরও চাপে মধ্যবিত্ত

ব্যবসায়ীদের রাত ৮টার সিদ্ধান্তের পর সরকার নির্ধারণ করল সন্ধ্যা ৬টা

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে দোকানপাটের সময়সীমা আরও কমলো ব্যবসায়ীদের রাত ৮টার সিদ্ধান্তের পর সরকার নির্ধারণ করল সন্ধ্যা ৬টা

‘তেলের মজুদ শেষ হওয়া প্রথম দেশ’ হওয়ার শঙ্কায় বাংলাদেশ

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদন ‘তেলের মজুদ শেষ হওয়া প্রথম দেশ’ হওয়ার শঙ্কায় বাংলাদেশ