সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে ১২ বছরের মেয়ে আলিফ চুপচাপ বসে ছিল। বাড়ির অন্যরা যখন দিনের কাজে ব্যস্ত, তখন তার মনে শুধু একটাই ভয়—আজ কি তার জীবনের এমন একটি ঘটনা ঘটবে, যা সে বুঝতেও পারবে না কিন্তু সারাজীবন বহন করতে হবে? আশপাশের বড়রা এটিকে “ঐতিহ্য” বলছিল, “মেয়ের সম্মান” বলছিল, কিন্তু মেয়েটির জন্য এটি ছিল শুধু অজানা ব্যথা, ভয়, এবং অপমানের ছায়া। সে জানত না যে তার শরীরের ওপর এই সিদ্ধান্ত তার নিজের নয়, সমাজের। এই নীরব ভয়ই আজও পৃথিবীর নানা দেশে লক্ষ লক্ষ মেয়ের বাস্তবতা।
এই গল্পটি কোনো একক পরিবারের নয়। এটি এমন অসংখ্য মেয়ের গল্প, যারা নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতি বা ফিমেইল জেনিটাল মিউটিলেশন (এফজিএম)-এর ঝুঁকিতে বড় হয়। অনেক সমাজে এই প্রথা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে আছে ধর্ম, সংস্কৃতি, সামাজিক চাপ, এবং বিবাহযোগ্যতার ভুল ধারণার কারণে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এটি কোনো নিরীহ প্রথা নয়; এটি শিশু ও নারীর শরীর, স্বাস্থ্য, এবং মর্যাদার ওপর এক ধরনের সহিংসতা।
নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতি বন্ধ করতে হলে শুধু আইন নয়, মানুষের মনও বদলাতে হবে।
বিশ্বজুড়ে ২৩ কোটির বেশি নারী ও মেয়ে এই ক্ষতিকর প্রথার শিকার হয়েছে, এবং বহু সমাজে এখনো এটি সামাজিক চাপের কারণে টিকে আছে।
এটি বন্ধ করার জন্য দরকার কমিউনিটি-ভিত্তিক আলোচনা, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সম্পৃক্ততা, মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, এবং বেঁচে যাওয়া নারীদের সহায়তা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের আপডেট অনুযায়ী এফজিএম প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য শিক্ষা, আইন প্রয়োগ, এবং সহায়তামূলক নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ; একই সঙ্গে গবেষণা-ভিত্তিক পর্যালোচনায় কমিউনিটি-ভিত্তিক পরিবর্তনকে সবচেয়ে কার্যকর পথ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতি (এফজিএম) বন্ধে কার্যকর কৌশল
নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতি বা এফজিএম একটি ক্ষতিকর প্রথা, যা বহু দেশে এখনো টিকে আছে। এটি বন্ধ করতে শুধু আইন যথেষ্ট নয়; পরিবার, সমাজ, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং তরুণ প্রজন্ম—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার।
১) কমিউনিটি-নেতৃত্বাধীন আলোচনা
গ্রামের মসজিদ, স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার, এবং নারী সমিতিতে খোলামেলা আলোচনা খুব কার্যকর। যখন মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকি, মানসিক ক্ষতি, এবং মানবাধিকারের বিষয়টি বুঝতে পারে, তখন সামাজিক চাপ কমে।
মূল বার্তা: “এটি স্বাস্থ্যকর নয়, ধর্মীয় বাধ্যবাধকতাও নয়, এবং কোনো মেয়ের উপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়”।
২) ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সম্পৃক্ত করা
অনেক পরিবার ধর্মীয় অনুমোদনের ভুল ধারণা থেকে এই প্রথা চালায়। তাই ইমাম, আলেম, জনপ্রিয় স্থানীয় নেতা, এবং সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বলা দরকার যে FGM কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয়।
নেতারা প্রকাশ্যে বিরোধিতা করলে পরিবারগুলোর জন্য “না” বলা সহজ হয়।
৩) মেয়েদের শিক্ষা ও স্কুলে ধরে রাখা
মেয়েদের শিক্ষা এফজিএম কমানোর অন্যতম শক্তিশালী উপায়। স্কুলে থাকা মেয়েরা নিজেদের অধিকার, স্বাস্থ্য, এবং সুরক্ষা সম্পর্কে বেশি জানে, আর শিক্ষিত মায়েরা সাধারণত এই প্রথার বিরুদ্ধে বেশি সচেতন হন।
তাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, স্কুলে উপস্থিতি বাড়ানো, এবং ঝরে পড়া কমানো এফজিএম প্রতিরোধের অংশ।
৪) স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ
ডাক্তার, নার্স, ধাত্রী, এবং কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কারদের এফজিএম সম্পর্কে প্রশিক্ষিত হতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ, পরামর্শ, এবং জটিলতা ব্যবস্থাপনার জন্য সক্ষমতা গড়ে তোলা দরকার।
তারা পরিবারকে বোঝাতে পারেন যে এতে কোনো স্বাস্থ্য-উপকার নেই, বরং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়।
৫) আইন প্রয়োগ ও শিশু সুরক্ষা
এফজিএম বিরোধী আইন থাকা দরকার, কিন্তু আইনকে কমিউনিটি আস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শুধু শাস্তি দিলে প্রথা গোপনে চলে যেতে পারে; তাই সুরক্ষা ব্যবস্থা, রিপোর্টিং চ্যানেল, এবং শিশু-সুরক্ষা নেটওয়ার্কও জরুরি।
শিশুদের ঝুঁকি শনাক্ত করে দ্রুত সহায়তা দেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।
৬) ছেলে ও পুরুষদের অন্তর্ভুক্ত করা
এফজিএম শুধু নারীর বিষয় নয়; সমাজে পুরুষদের মতামতও পরিবার-নির্ণয়ে প্রভাব ফেলে। WHO-এর সুপারিশে FGM-প্রভাবিত কমিউনিটির পুরুষ ও ছেলেদেরও শিক্ষামূলক কর্মসূচিতে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
যখন পিতা, ভাই, স্বামী, এবং তরুণ ছেলেরা প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে, তখন সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল হয়।
৭) বেঁচে যাওয়া নারীদের সহায়তা
যাদের এফজিএম হয়েছে, তাদের জন্য গোপনীয়, সম্মানজনক, এবং মানসিক সহায়তাসহ চিকিৎসা প্রয়োজন। ব্যথা, সংক্রমণ, প্রসব জটিলতা, এবং মানসিক আঘাতের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
সারভাইভার-সমর্থন থাকলে কমিউনিটি আরও সহজে বুঝতে পারে যে এটি ক্ষতিকর প্রথা, স্বাভাবিক কোনো রীতি নয়।
৮) সামাজিক নিয়ম বদলানো
সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হলো সামাজিক নিয়ম বদলানো। যখন একটি কমিউনিটিতে পরিবারগুলো একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা আর এই প্রথা চালাবে না, তখন পরিবর্তন স্থায়ী হয়।
পাবলিক ঘোষণা, স্থানীয় চুক্তি, এবং ধারাবাহিক ফলো-আপ এই প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে।
লেখকঃ জাহিদুল হাসান একটি বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীর সিএসআর ও সাসটেইনেবিলিটি বিভাগের প্রধান নির্বাহী এবং জাতিসংঘের সাবেক পেশাজীবী
zahidworks@gmail.com