বাংলা ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রতীক। মাতৃভাষার মাধ্যমে যে গভীর অনুভূতি ও বোধ তৈরি হয়, তা বিদেশি কোনো ভাষায় সম্ভব নয়। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তাঁর অমর একুশের ষাট বছর গ্রন্থে লিখেছিলেন, মাতৃভাষার সর্বগামিতা ছাড়া মানুষের চিন্তা ও অনুভূতি পূর্ণতা পায় না। তিনি অস্ট্রেলিয়ার ভাষা গবেষক জুন অস্কারের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, নিজের ভাষায় যে আবেগ প্রকাশ করা যায়, ইংরেজিতে তা কখনোই পুরোপুরি সম্ভব নয়।
১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন। পরের বছর তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা দেন, “বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা।” কিন্তু একই সঙ্গে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন যে স্বাধীনতার তিন বছর পরও অফিস-আদালতে ইংরেজি নথিপত্রই প্রাধান্য পাচ্ছে। তাঁর ক্ষোভ ছিল—যাদের মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা নেই, তাদের দেশের প্রতি ভালোবাসা নিয়েও সন্দেহ থাকে।
আজও সেই প্রেক্ষাপট পুরোপুরি বদলায়নি। বাংলার প্রতি ভালোবাসা বাড়লেও ইংরেজির প্রতি আকর্ষণ কমেনি। বরং ইংরেজিতে দুর্বলতা বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই মনে করেন, দেশকে এগিয়ে নিতে মাতৃভাষা যথেষ্ট নয়। অথচ বুদ্ধির মুক্তি ও জ্ঞানের বিস্তার ঘটাতে হলে মাতৃভাষার ওপর নির্ভর করাই একমাত্র পথ।
একুশ আমাদের অহংকার, কারণ এটি ভাষার জন্য আত্মত্যাগের প্রতীক। ভাষা আন্দোলনের শহীদরা প্রমাণ করেছেন, মাতৃভাষা শুধু সাংস্কৃতিক পরিচয় নয়, এটি স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার ভিত্তি। তাই একুশের চেতনা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেশকে এগিয়ে নিতে হলে বাংলাকে কেন্দ্র করেই জ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিস্তার ঘটাতে হবে।
বাংলা ভাষা আমাদের জাতীয় পরিচয়ের মূলভিত্তি। একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু স্মৃতিচারণ নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ পথনির্দেশ। মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা ও দক্ষতা ছাড়া কোনো জাতি টেকসই অগ্রগতি অর্জন করতে পারে না। তাই একুশ আমাদের অহংকার, আমাদের শক্তি, আমাদের পথপ্রদর্শক।