বাংলাদেশে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সব দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশে সক্রিয় এজেন্সির সংখ্যা ২ হাজার ৬৪৬। সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় নতুন করে আরও ২৫২টি এজেন্সিকে লাইসেন্স দিয়েছে। অথচ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিবিষয়ক শ্বেতপত্র কমিটি তাদের প্রতিবেদনে এ সংখ্যা কমিয়ে আনার সুপারিশ করেছিল।
ভারতে ২০২৫ সালে প্রবাসীরা ১৩৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠালেও সেখানে রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে ১ হাজার ৯৮৮টি। একই সময়ে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩১ বিলিয়ন ডলার। পাকিস্তানে এজেন্সি ২ হাজার ৫৪৫টি, নেপালে ১ হাজার ৪১টি এবং শ্রীলঙ্কায় ৮৫৭টি। ভুটানে এ সংখ্যা মাত্র ৩১। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশে এজেন্সির সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এজেন্সির সংখ্যা বাড়লেও সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে প্রতারণা, মানব পাচার ও দালালদের দৌরাত্ম্য আরও বাড়বে। শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, অধিকাংশ এজেন্সির অফিস ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় তারা মাঠ পর্যায়ে দালালদের ওপর নির্ভর করে। এতে স্বচ্ছতার অভাব তৈরি হয় এবং কর্মীরা প্রতারণার শিকার হন। গত এক দশকে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে গেছে, যার বড় অংশ ভিসা ক্রয়ের নামে এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে সরানো হয়েছে।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিভিন্ন এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ে ২ হাজার ২১৩টি। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩৮০। প্রতি বছরই হাজারো অভিযোগ জমা পড়লেও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় প্রতারণা ও হয়রানি কমছে না। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মানব পাচারের অভিযোগে মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৫৪৬টি, আসামি হয়েছেন ১৯ হাজারের বেশি। সাজা হয়েছে মাত্র ১৫৭ জনের।
অভিবাসন ব্যয়ও বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে বিদেশ যেতে আগ্রহী কর্মীদের মধ্যে ১৯ শতাংশ শেষ পর্যন্ত যেতে পারেননি। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫৯ কোটি ডলার।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ১১ লাখ ৩১ হাজার কর্মী বিদেশে গেছেন, এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই সৌদি আরবে। তবে ওমান, বাহরাইন, লিবিয়া, সুদান, মিসর, রোমানিয়া ও ব্রুনাইয়ের শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেছে। মালয়েশিয়াও সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কারণে কর্মী নেয়া বন্ধ রেখেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত আনুষ্ঠানিকভাবে বাজার বন্ধ না করলেও ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ভিসা ইস্যু বন্ধ রয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর মনে করেন, নতুন লাইসেন্স দেয়ার আগে বিদ্যমান এজেন্সিগুলোর কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা জরুরি ছিল। তিনি বলেন, দালাল সমস্যা সমাধান না হলে শুধু লাইসেন্স বাড়িয়ে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। অনেক এজেন্সি সরাসরি কর্মী না পাঠিয়ে সাব-এজেন্টের মতো কাজ করছে।
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, নতুন লাইসেন্স দেয়ায় ইতিবাচক দিক হলো অনেককে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হচ্ছে। তবে সফলতা নির্ভর করবে নতুন শ্রমবাজার তৈরির ওপর। সিন্ডিকেট প্রথা দূর করে সব এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া বলেন, লাইসেন্স দেয়া মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তবে এজেন্সির সংখ্যা বেশি হলে সিন্ডিকেট হওয়ার আশঙ্কা কমে। প্রতিটি এজেন্সি যদি অন্তত একজন কর্মী পাঠায়, তবে মোট সংখ্যা বাড়বে। অসাধুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
অভিবাসন খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা, দালালদের নিয়ন্ত্রণ এবং নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করাই এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা বাড়লেও বিদেশগামী কর্মীদের প্রতারণা ও হয়রানি কমবে না, বরং দেশের ভাবমূর্তি আরও ক্ষুণ্ন হবে।