দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আবারও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ নভেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন মোট ৯১ হাজার ৬০২ জন, এবং প্রাণ হারিয়েছেন ৩৬৭ জন। ২৬ নভেম্বর প্রকাশিত দৈনিক প্রতিবেদনে আরও তিনজনের মৃত্যুসহ মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭০ জন। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬১৫ জন রোগী।
শীত মৌসুম শুরু হলেও সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা কমার পরিবর্তে উল্টো বৃদ্ধি পাচ্ছে যা বিশেষজ্ঞদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাসার জানিয়েছেন, চলতি ডিসেম্বর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তার মতে, ঢাকার বহুতল ভবনের বেসমেন্ট, নির্মাণাধীন ভবন এবং পানির সংকট–পীড়িত এলাকাগুলোতে জমে থাকা পানিই এডিস মশার বংশবৃদ্ধির বড় উৎস। এখনও বহু এলাকায় লার্ভার ঘনত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকায় সংক্রমণের হার কমার সুযোগ নেই।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। শুধুমাত্র নভেম্বরেই আক্রান্ত হয়েছেন ২১ হাজার ৭৪০ জন, যা বছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাসিক সংক্রমণ। অক্টোবর মাসে ভর্তি হয়েছিলেন ২২ হাজার ৫২০ জন, সেপ্টেম্বর ১৫ হাজার ৮৬৬ জন এবং আগস্টে ১০ হাজার ৪৯৬ জন। মৃত্যুর সংখ্যা একইভাবে ঊর্ধ্বমুখী—নভেম্বরে মৃত্যু হয়েছে ৮৯ জনের, যা বছরের সর্বোচ্চ।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা আক্রান্ত ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে সর্বাধিক ঝুঁকিতে রয়েছে। লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যান দেখায়, পুরুষ আক্রান্ত ৬২.৪ শতাংশ এবং নারী ৩৭.৬ শতাংশ; বাইরে বেশি সময় থাকার কারণে পুরুষদের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
ভৌগোলিক বিশ্লেষণে জানা যায়, বরিশাল বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ এবং সিলেট বিভাগে সর্বনিম্ন। তবে মৃত্যুর দিক থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ—এখানেই প্রাণহানি হয়েছে ১৬৭ জনের। ঢাকা উত্তর সিটিতে মৃত্যু ৬২ জন এবং বরিশালে ৪৭ জন।
গত ছয় বছরের সংক্রমণগত প্রবণতাও ভয়াবহ। ২০২৩ সালে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক রূপ নেয় সে বছর আক্রান্ত হয়েছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন, মারা যান ১,৭০৫ জন। ২০২৫ সালেও আক্রান্তের গতি কমার লক্ষণ নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এডিস নিয়ন্ত্রণে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ, নিয়মিত বেসমেন্ট–পরিচর্যা, নির্মাণস্থল তদারকি এবং নাগরিক সচেতনতা না বাড়ালে ডিসেম্বরেই পরিস্থিতি অতি সংকটজনক হতে পারে।