নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য হিসেবে এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ-এর সদস্য হিসেবে একসঙ্গে দুটি শপথ নেওয়ার সিদ্ধান্তের আইনি ও সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্বিতীয় শপথের কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।
রোববার সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মৌলা জানান, মঙ্গলবার সকালে এমপিরা দুটি শপথ নেবেন। বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, তাদের আইনপ্রণেতারা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দল জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং বাস্তবায়ন আদেশ মেনে চলবে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আহসানুল মাহবুব জুবায়েরও একই অবস্থান জানান।
তবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক, আহসানুল করিম ও মঞ্জিল মুরশিদ দ্বিতীয় শপথকে ‘অসাংবিধানিক’ আখ্যা দিয়েছেন। তাদের যুক্তি, বর্তমান সংবিধানের কাঠামোর ভেতরে রাষ্ট্রপতির এমন কোনো আদেশ জারির ক্ষমতা নেই। অতীতে রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির নজির ছিল সংবিধান স্থগিত বা অনুপস্থিত থাকলে; কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও সংবিধান বহাল ছিল। ফলে সংসদ সদস্যরা জনগণের ভোটে এমপি হয়েছেন, সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নয়। তাই তাদের বৈধ শপথ একটিই, সেটি সংসদ সদস্যের শপথ—এমনটাই তাদের বক্তব্য।
মঞ্জিল মুরশিদ মনে করিয়ে দেন, সংবিধান সংশোধনের পথ ১৪২ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট—দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও রাষ্ট্রপতির সম্মতি। তার মতে, ক্ষমতায় এসে সংসদীয় প্রক্রিয়াতেই সংস্কার করতে হবে। আহসানুল করিমও একই সুরে বলেন, সাংবিধানিক পদ্ধতি পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক অর্ডার দিয়ে কাঠামোগত পরিবর্তন টেকসই হবে না।
তবে বিএনপি ও জামায়াত ঘনিষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া, রুহুল কুদ্দুস কাজল ও তানিম হোসেন শাওন ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাদের দাবি, ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট জুলাই সনদকে রাজনৈতিক বৈধতা দিয়েছে এবং সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণের সার্বভৌমত্বের যে নীতি, তার আলোকে এটি ‘জনমতের প্রতিফলন’। তাদের মতে, দ্বিতীয় শপথ সাংবিধানিকভাবে বাধ্যতামূলক না হলেও রাজনৈতিক ঐকমত্যের অংশ।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রিয়াজ বলেন, ২০২৬ সালের গণভোটের রায় বাস্তবায়ন রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিক দায়িত্ব। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংস্কার পরিষদ সংসদের প্রথম বৈঠক থেকে ১৮০ কর্মদিবসের মধ্যে কাজ শেষ করবে এবং পরে বিলুপ্ত হবে। পরিষদের চেয়ারম্যান-ডেপুটি চেয়ারম্যান প্রথম অধিবেশনে নির্বাচিত হবেন।
তবে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, সংসদের সমান্তরালে আরেকটি কাঠামো তৈরি করে সংস্কার চালানো হলে তা কি ক্ষমতার দ্বৈততা তৈরি করবে না? রাজনৈতিক ঐকমত্য ও গণভোটের ফলাফলকে সম্মান জানানো যেমন জরুরি, তেমনি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও আইনি দৃঢ়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় ভবিষ্যতে যেকোনো সরকার রাজনৈতিক সমর্থন দেখিয়ে সাংবিধানিক বিধান পাশ কাটানোর নজির দাঁড় করাতে পারে যা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।