সর্বশেষ

বছর শেষে বাংলাদেশ

বেকারত্বের দুঃসহ রেকর্ডের বছর ২০২৫

প্রকাশিত: ২ জানুয়ারি ২০২৬, ২১:৩৫
বেকারত্বের দুঃসহ রেকর্ডের বছর ২০২৫

২০২৫ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং শ্রমবাজারের জন্য ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন বছর। শিল্প ও উৎপাদন খাতে কঠিন মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং বাধা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে বেকারত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বছর নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি; বরঞ্চ দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ হয়েছে শত শত কারখানা, ফলে লাখো শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন এবং সামাজিক অস্থিরতা তীব্র হয়েছে।

 

২০২৫ সালে দেশের শিল্প-কারখানা বন্ধের ঘটনা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। সরকারি ও বেসরকারি সূত্র অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৩৫০টির বেশি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, যার অধিকাংশই তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার ও টেক্সটাইল খাতের। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, গত এক বছরে ২৫৮টি রফতানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। চট্টগ্রামে পোশাক ও জাহাজ ভাঙা শিল্প মিলিয়ে কমপক্ষে ২৬০টি কারখানায় তালা ঝুলছে। সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে একত্রে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিক অসন্তোষ ও আন্দোলনের কারণে বহু কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত কারখানা বন্ধের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

এই শিল্প সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধেই প্রায় ২১ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ১৮ লাখই নারী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে দেখা যায়, ত্রৈমাসিক শ্রম শক্তি জরিপ অনুযায়ী জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৪ সময়ের তুলনায় ২০২৫ সালে আরও ১ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ বেকার হিসেবে যুক্ত হয়েছে এবং মোট বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখের বেশি। শুধু শিল্পাঞ্চলগুলোতেই বেকারত্বের চিত্র ভয়াবহ। সাভারে প্রায় ৩১ হাজার, গাজীপুরে প্রায় ৭৩ হাজার, নারায়ণগঞ্জে পাঁচ হাজারের বেশি এবং চট্টগ্রামে অন্তত ১০ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন গড়ে চার হাজারের বেশি মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।

 

বেকারত্বের এই বিস্তার শুধু শিল্পখাতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেবা খাত, নির্মাণ খাত এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারেও এর প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বহুমুখী সংকট একসঙ্গে কাজ করায় পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে গেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান বাজারগুলোতে শুল্ক বৃদ্ধি বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলা কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারেনি।

 

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। জ্বালানি সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং অনেক কারখানা কার্যত অলাভজনক হয়ে পড়েছে। ব্যাংকিং খাতে উচ্চ সুদহার ও কঠোর ঋণনীতির কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়েছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কমে গেছে। বিদেশি ক্রেতা ও বায়ারদের মধ্যে অর্ডার দেওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে, যা শ্রমবাজারের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করেছে।

 

বেকারত্বের এই ব্যাপক বিস্তার সমাজে গভীর মানবিক ও সামাজিক প্রভাব ফেলেছে। বহু শ্রমিক কাজ হারিয়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন অথবা কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন। অনেকে জীবিকার তাগিদে রিকশা বা অটোরিকশা চালানো, দিনমজুরি কিংবা খণ্ডকালীন কাজে নেমেছেন। কর্মহীনতা থেকে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ায় কিছু ক্ষেত্রে অপরাধপ্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সমাজ বিশ্লেষকদের অভিমত। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নারী শ্রমিকরা। কর্মসংস্থান হারানোর পর অনেক নারী পুনরায় শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন না এবং অর্থনৈতিকভাবে আরও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ছেন।

 

সরকার এবং নীতিনির্ধারক মহল পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কারখানা বন্ধের পর শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধের জন্য প্রণোদনা ও তহবিল ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছে। কোথাও কোথাও শ্রমিক পুনর্বাসন ও পুনরায় কর্মসংস্থানের পরিকল্পনার কথা বলা হলেও বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ সংকটের তুলনায় খুবই সীমিত। তারা মনে করছেন, ব্যাপক ও কার্যকর নীতিগত হস্তক্ষেপ ছাড়া শ্রমবাজারের এই অবনতি থামানো কঠিন।

 

২০২৫ সালের এই বেকারত্ব সংকট বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। ২০২৬ সালের দিকে তাকিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন বিনিয়োগবান্ধব নীতি, শিল্প পুনরুদ্ধার, শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং নারীদের জন্য বিশেষ কর্মসংস্থান কর্মসূচি ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। বিপুল সংখ্যক বেকার জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করতে না পারলে আগামী বছরগুলোতেও এই সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব খবর

আরও পড়ুন

গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এনজিও সহায়তার আহ্বান বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা কি প্রশ্নের মুখে? গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এনজিও সহায়তার আহ্বান বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের

উত্তর কোরিয়া এবং ফিলিস্তিনের চেয়েও দুর্বল বাংলাদেশী পাসপোর্ট

পাসপোর্ট ইনডেক্স ২০২৬ উত্তর কোরিয়া এবং ফিলিস্তিনের চেয়েও দুর্বল বাংলাদেশী পাসপোর্ট

অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলে নির্বাচন গণতান্ত্রিক নয়

চার ব্রিটিশ এমপির বিবৃতি অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলে নির্বাচন গণতান্ত্রিক নয়

অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ব্যর্থতায় দীর্ঘায়িত হচ্ছে এলপিজি সংকট

দুই সপ্তাহেও সমাধান নেই অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ব্যর্থতায় দীর্ঘায়িত হচ্ছে এলপিজি সংকট

অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত প্রস্তুতি ও সক্ষমতার ঘাটতিতে এডিপির আকার কমল ১৩ শতাংশ

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বড় কাটছাঁট অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত প্রস্তুতি ও সক্ষমতার ঘাটতিতে এডিপির আকার কমল ১৩ শতাংশ

নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক মানে সবার অংশগ্রহণ

ইইউ পর্যবেক্ষক দলের প্রধান নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক মানে সবার অংশগ্রহণ

বাংলাদেশে নিযুক্ত নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে শপথ নিলেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন

বাংলাদেশে নিযুক্ত নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে শপথ নিলেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন

বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ বললেন ব্রিটিশ এমপি প্রীতি প্যাটেল

ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার আহ্বান বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ বললেন ব্রিটিশ এমপি প্রীতি প্যাটেল