মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমদানিনির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম জ্বালানিশূন্য দেশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পারস্য উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থল হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং তেল পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়েছে। এই প্রণালির মাধ্যমে এশিয়ার অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ সরবরাহ হয়। ফলে সরবরাহে যেকোনো বিঘ্ন সরাসরি প্রভাব ফেলছে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে।
প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। এ পরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানি রেশনিং, ডিজেল বিক্রিতে বিধিনিষেধ এবং পরিবহন খাতে চাপ বাড়তে দেখা গেছে। বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, এমনকি জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় অনেক পাম্প বন্ধ রাখার ঘটনাও সামনে এসেছে। রাজধানীর বাইরে সংকট আরও তীব্র, যেখানে বোতলে করে অতিরিক্ত দামে জ্বালানি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি সূত্রে অবশ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দাবি করেছেন, দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই; বরং গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বেড়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার টনের বেশি জ্বালানি মজুত রয়েছে, যার মধ্যে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও জেট ফুয়েল অন্তর্ভুক্ত।
তবে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুত ছিল, যা দিয়ে বড়জোর দুই সপ্তাহের মতো চাহিদা পূরণ সম্ভব। একইসঙ্গে ডিজেলের মজুতও সীমিত পর্যায়ে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের চেষ্টা করছে। পাশাপাশি রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানিতে বিশেষ ছাড় পেতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা বাংলাদেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বৈশ্বিক বাজারে দাম বাড়া ও সরবরাহ ব্যাহত হলে তা সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং পরিবহন খাতে প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট অব্যাহত থাকলে লোডশেডিং বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশ কার্যত অচল হয়ে পড়তে পারে। যদিও সরকার এ ধরনের শঙ্কা নাকচ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা বলছে, বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।